নেকাব পরা ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী’ বলার অভিযোগ, ঢাবি শিক্ষককে ক্লাস থেকে অব্যাহতি

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৯ পিএম
নেকাব পরা ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী’ বলার অভিযোগ, ঢাবি শিক্ষককে ক্লাস থেকে অব্যাহতি

সংগৃহীত

ঢাবি প্রতিনিধি


নেকাব পরা এক ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী’, ‘জঙ্গি’ ও ‘বোমা মারতে পারে’—এমন মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে। শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই শিক্ষককে সব ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিভাগের একাডেমিক কমিটি। একই সঙ্গে তাঁর নেওয়া কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা হয়েছে।


বুধবার (৭ অক্টোবর) ইংরেজি বিভাগের ১৫তম ব্যাচের (২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ) একটি ক্লাসে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। পরে কয়েকজন শিক্ষার্থী বিভাগীয় চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা ডেকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।


ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাজিন আজিজ চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা হয়েছে। অভিযোগ ও সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সভায় একটি রেজুলেশন নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা হয়েছে।


তিনি জানান, বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। বিভাগীয় চেয়ারম্যান বা একাডেমিক কমিটির এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই।


শিক্ষার্থীর অভিযোগ


ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মল্লিকার অভিযোগ, ক্লাসে তাঁর নেকাব ও পোশাক নিয়ে শিক্ষক আপত্তিকর মন্তব্য করেন। একপর্যায়ে শিক্ষক তাঁকে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসতে বলেন এবং তাঁর উপস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করছেন বলে জানান।


মল্লিকার দাবি, নেকাব ও হিজাব নিয়ে এর আগেও ওই শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়েছে। শিক্ষক তাঁর পোশাক নিয়ে প্রশ্ন করেছেন এবং কেন এভাবে পোশাক পরেছেন, তা জানতে চেয়েছেন। এমনকি শিক্ষক নিজের হজ পালনের বিষয় উল্লেখ করে সেখানে মুখ খোলা যায় বলেও মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ তাঁর।


এর আগের একটি ক্লাসে শিক্ষক মুখ ঢেকে এভাবে চললে নেকাব খুলে দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেন মল্লিকা। পরে তিনি অফিস আওয়ারে দেখা করে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করার এবং পরিচয়পত্র দেখানোর প্রস্তাব দেন। তবে এরপরও তাঁকে শনাক্ত করার বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি তাঁর।


‘জঙ্গি’ ও ‘বোমা মারতে পারে’ মন্তব্যের অভিযোগ


ইংরেজি বিভাগের ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাইসা মণি সুমিও ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্লাসে ইসলামবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।


সুমির দাবি, ঘটনার দিন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পোশাক নিয়ে কথা বলার সময় তিনি ওই শিক্ষার্থীকে সমর্থন করেন। এ সময় শিক্ষক মাযহাব ও ইসলাম পালনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করেন। একপর্যায়ে শিক্ষক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে ‘জঙ্গি’ এবং তিনি ‘বোমা মারতে পারেন’—এমন মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ সুমির।


তিনি আরও অভিযোগ করেন, আফগানিস্তান ও ফিলিস্তিনের মানুষের পোশাকের উদাহরণ দিয়ে পর্দার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যের কথা বললেও শিক্ষক তাঁকে কথা বলার সুযোগ দেননি। পোশাকের সীমা নিয়েও শিক্ষক মন্তব্য করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী ক্লাস থেকে বের হয়ে যান বলেও জানান সুমি।


এ ছাড়া শিক্ষক শিক্ষার্থীদের হুমকি দিয়েছেন এবং নিজেকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।


প্রশাসনের বক্তব্য


ঘটনার দিন বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানিয়েছিলেন, বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে বিষয়টি মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জরুরি একাডেমিক কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।


এরপর শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার বিভাগের জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কোর্সগুলো পুনর্বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।


তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।


এমকে/বিএম২৪