চট্টগ্রামের রক্তাক্ত জুলাই: দুই বছর পরও বিচারের অপেক্ষা

প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৫ পিএম
চট্টগ্রামের রক্তাক্ত জুলাই: দুই বছর পরও বিচারের অপেক্ষা

সূত্রঃ সংগৃহীত

মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম


দুই বছর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামের নিউমার্কেট, মুরাদপুর, ষোলশহর, বহদ্দারহাট ও আদালতপাড়া ছিল সংঘর্ষ, টিয়ারশেলের ধোঁয়া এবং গুলির শব্দে উত্তাল। এখন এসব এলাকায় স্বাভাবিক জনজীবন ফিরেছে। তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষ, আহত ব্যক্তিরা এবং নিহতদের স্বজনদের কাছে সেই দিনগুলোর স্মৃতি এখনও গভীর ক্ষতের মতো রয়ে গেছে। কারণ, রক্তাক্ত সেই ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি।


২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারবিরোধী এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয়। রাজধানীর পাশাপাশি চট্টগ্রামও হয়ে ওঠে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া কর্মসূচিতে পরে শ্রমিক, রিকশাচালক, দোকানকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন।


চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পেরিয়ে রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে। নিউমার্কেট, ষোলশহর, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, আন্দরকিল্লা ও আদালতপাড়া প্রতিদিনের কর্মসূচির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক পুষ্পিতা নাথের ভাষ্য, ১১ জুলাই চট্টগ্রামে পুলিশের হামলা এবং ১৫ জুলাই ঢাকার সংঘর্ষের পর আন্দোলনের ধরন বদলে যায়। এরপর দাবি শুধু কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ না থেকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়।


১৬ জুলাই ছিল চট্টগ্রামের আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেদিন ষোলশহরে সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম, ছাত্রশিবির নেতা ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং শ্রমিক ওমর ফারুক নিহত হন। আন্দোলন-সংশ্লিষ্টদের মতে, ওই ঘটনার পর আন্দোলনে নতুন গতি আসে এবং মানুষের অধিকার ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।


জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা কার্যত সংঘর্ষের ময়দানে পরিণত হয়। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। নিউমার্কেট, জিইসি মোড়, টাইগারপাস, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট ও আন্দরকিল্লায় চলে গুলি, টিয়ারশেল এবং ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। পরে শুরু হয় ব্লক রেইড ও গণগ্রেপ্তার। দমন-পীড়নের অভিযোগের মধ্যেও শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের একাংশ সংহতি জানালে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়।


২ আগস্ট আন্দরকিল্লা থেকে হাজারো মানুষের গণমিছিল বের হয়। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে মিছিলটি নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরদিন ৩ আগস্ট নিউমার্কেটে অনুষ্ঠিত বড় সমাবেশে সরকার পদত্যাগের এক দফা দাবির ঘোষণা দিলে আন্দোলনে নতুন গতি আসে এবং সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়।


সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম মহানগর ও ১৫ উপজেলায় অন্তত ১২ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষার্থী, শ্রমিক, রিকশাচালক, দোকানকর্মী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মী। সরকারি হিসাবে আহত হন প্রায় ৯০০ জন। তাঁদের অনেকেই এখনও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। কেউ চোখ হারিয়েছেন, কেউ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।


৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দিন চট্টগ্রামেও বড় ধরনের ঘটনা ঘটে। নগরের ১৬টি থানার মধ্যে আটটিতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে আওয়ামী লীগের অনেক প্রভাবশালী নেতা আত্মগোপনে চলে যান। সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সিটি করপোরেশনের মেয়র ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়। কেউ গ্রেপ্তার হন, কেউ দেশ ছাড়েন, আবার অনেকে এখনও পলাতক।


গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ১৫১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৯টি থানায় এবং বাকিগুলো আদালতে নালিশি মামলা হিসেবে দায়ের করা হয়েছে। তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মাত্র একটি মামলার তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। অধিকাংশ মামলাই এখনও তদন্তাধীন।


তদন্তের ধীরগতিতে হতাশ নিহতদের পরিবার। তাঁদের অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া দৃশ্যমান অগ্রগতি পাচ্ছে না। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং নিরপরাধদের হয়রানি বন্ধের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।


আন্দোলনে নিহত ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরামের মা জ্যোৎস্না বেগম বলেন, “আমার বুকের ধনকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বিচার হবে বলে আশ্বাস পেয়েছি, কিন্তু দুই বছর পরও তা দেখিনি। জীবনের শেষ সময়ের আগে সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চাই।”


এই অপেক্ষা শুধু তাঁর নয়; একই প্রত্যাশায় রয়েছেন অন্য নিহতদের স্বজনরাও। আহতদের অনেকেই মনে করেন, প্রকৃত বিচারই তাঁদের ত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতি হবে।


আজ চট্টগ্রামের রাজপথে স্বাভাবিক ব্যস্ততা ফিরে এলেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোর স্মৃতি এখনও মুছে যায়নি। পুরোনো স্লোগানের বিবর্ণ চিহ্ন, সংঘর্ষস্থলের স্মৃতি এবং স্বজন হারানোর বেদনা এখনও বহন করে চলেছেন অনেক মানুষ। তাই দুই বছর পরও প্রশ্নটি একই রয়ে গেছে—জুলাইয়ের সেই প্রাণহানি ও সহিংসতার ঘটনার বিচার কবে সম্পন্ন হবে? নিহতদের পরিবার, আহত ব্যক্তি এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা এখনও সেই উত্তরের অপেক্ষায়।



এমকে/বিএম২৪