মিথ্যা: ক্ষণিকের আশ্রয়, আজীবনের বোঝা

প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৫ পিএম
মিথ্যা: ক্ষণিকের আশ্রয়, আজীবনের বোঝা

মিথ্যা কখনো শুধু একটি ভুল বাক্য নয়; মিথ্যা হলো বিশ্বাসের ওপর অদৃশ্য আঘাত। সত্যকে আড়াল করার জন্য মানুষ যখন মিথ্যার আশ্রয় নেয়, তখন সে হয়তো মনে করে সাময়িকভাবে একটি সমস্যা থেকে মুক্তি পেলো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি মিথ্যা ঢাকতে আরও দশটি মিথ্যা বলতে হয়। এভাবেই মানুষ একসময় নিজের তৈরি জালের ভেতর নিজেই আটকা পড়ে।


মিথ্যার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে। একটি সম্পর্ক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে সেটি জোড়া লাগানো সম্ভব হলেও আগের মতো দৃঢ় থাকে না। কাঁচ ভেঙে আবার জোড়া লাগানো যায়, কিন্তু ভাঙার দাগ থেকে যায়। তেমনি মিথ্যা ধরা পড়লে ক্ষমা পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেই আগের নির্ভরতা আর ফিরে আসে না।


অনেকেই মনে করেন, "ছোট্ট একটা মিথ্যা বললে কী এমন হবে?" অথচ বড় প্রতারণার শুরু হয় এমন ছোট ছোট মিথ্যা থেকেই। মানুষ ধীরে ধীরে মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একসময় সে বুঝতেই পারে না কোনটা সত্য আর কোনটা অভিনয়। তখন তার মুখে হাসি থাকলেও মনে থাকে অস্থিরতা। আজ না হয় কাল, সত্য প্রকাশ পাবেই।


সত্যকে লুকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু চিরদিনের জন্য নয়। সময়ের নিজস্ব একটি শক্তি আছে। সময় ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে, তারপর একদিন সমস্ত মুখোশ খুলে দেয়। তখন মানুষ বুঝতে পারে, সত্যকে হারানো যায় না; তাকে কেবল কিছু সময়ের জন্য আড়াল করা যায়।


মিথ্যা মানুষকে সাময়িক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সম্মান দিতে পারে না। যে মানুষ সত্যবাদী, সে হয়তো কখনো কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ তার ওপরই আস্থা রাখে। কারণ সত্যের পথ কঠিন হলেও সেই পথেই আত্মমর্যাদা, শান্তি ও সম্মান রয়েছে।


ইতিহাস সাক্ষী—অনেক ক্ষমতাবান ব্যক্তি, অনেক বড় প্রতিষ্ঠান, এমনকি অনেক রাষ্ট্রও মিথ্যার ওপর নিজেদের দাঁড় করাতে চেয়েছিল। কিন্তু সময়ের বিচারে সত্যই টিকে থেকেছে। মিথ্যার প্রাসাদ যত উঁচুই হোক, তার ভিত্তি দুর্বল। আর দুর্বল ভিত্তির ওপর কোনো স্থায়ী ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না।


ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মিথ্যা একটি গুরুতর নৈতিক অপরাধ। ইসলামে সত্যবাদিতাকে ঈমানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে। একজন মুমিনের পরিচয় তার কথায়, কাজে ও চরিত্রে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সত্যবাদিতাকে জান্নাতের পথ এবং মিথ্যাকে ধ্বংসের পথ হিসেবে শিক্ষা দিয়েছেন। কারণ মিথ্যা কেবল একটি গুনাহ নয়; এটি অন্যায়, প্রতারণা, অবিচার ও বিশ্বাসঘাতকতার দরজাও খুলে দেয়।


সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, মানুষ যখন বারবার মিথ্যা বলে, তখন সে একসময় নিজের কাছেও মিথ্যা বলতে শুরু করে। নিজের ভুলকে সঠিক মনে হয়, অন্যায়কে ন্যায় মনে হয়, বিবেকের কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তখন তার পতন শুরু হয়, যদিও সে নিজে তা বুঝতে পারে না।


একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য তার ধন-সম্পদ, পদ-পদবি বা খ্যাতিতে নয়; তার মূল্য নির্ধারিত হয় তার সততা দিয়ে। সততা এমন একটি সম্পদ, যা হারিয়ে গেলে অর্থ দিয়ে কেনা যায় না। আর মিথ্যা এমন একটি ঋণ, যার সুদ মানুষকে সারাজীবন দিতে হয়।

আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষ সত্য বলার সাহস রাখবে; ভুল করলে স্বীকার করবে; প্রতারণার বদলে সততাকে বেছে নেবে। কারণ সত্য হয়তো কিছু সময়ের জন্য কষ্ট দেয়, কিন্তু মিথ্যা সারাজীবনের অনুশোচনা উপহার দেয়।


মনে রাখা উচিত—মিথ্যার গতি দ্রুত হতে পারে, কিন্তু সত্যের শক্তি অনেক গভীর। মিথ্যা মানুষের চোখকে ধোঁকা দিতে পারে, কিন্তু বিবেককে নয়। সত্য হয়তো ধীরে হাঁটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছায়। আর মিথ্যা যত সুন্দর পোশাকই পরুক না কেন, একদিন না একদিন তার মুখোশ খুলবেই।

তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্যকে আঁকড়ে ধরা উচিত। কারণ সত্য মানুষকে ছোট করে না, বরং মর্যাদাবান করে। আর মিথ্যা মানুষকে সাময়িকভাবে বড় দেখালেও শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের কাছেই ছোট করে দেয়। সত্যের পথ কঠিন হতে পারে, কিন্তু সেই পথেই রয়েছে আত্মসম্মান, আস্থা, ন্যায়বিচার এবং প্রকৃত সফলতার ভিত্তি।


লেখক:

মোঃ জাহেরুল ইসলাম

শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ