কুড়িগ্রামে বালু গবেষণা কেন্দ্র নিয়ে বিভ্রান্তি, দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি
সংগৃহীত
শাহীন আহমেদ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
কুড়িগ্রামে প্রস্তাবিত বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসনের বক্তব্যে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। সম্ভাব্য এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিপুল কর্মসংস্থান ও খনিজ সম্পদভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ঘটতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয়, অর্থনৈতিক লাভ এবং বাস্তবায়ন নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর বালুতে থাকা মূল্যবান খনিজ সম্পদ গবেষণা, পৃথকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঘটানো সম্ভব। প্রকল্পটির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং বছরে বিপুল রাজস্ব আয়ের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতার ওপর নির্ভরশীল।
যেসব খনিজ সম্পদ নিয়ে সম্ভাবনা
ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর বালুতে ইলমেনাইট, জিরকন, ম্যাগনেটাইট, রুটাইল, গারনেট ও কোয়ার্টজের মতো খনিজ থাকার কথা জানিয়েছেন ভূতাত্ত্বিক গবেষকেরা। এসব খনিজ রং, প্লাস্টিক, সিরামিক, ইলেকট্রনিকস, ধাতব শিল্প, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। খনিজগুলো পৃথক করে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে দেশীয় শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন গবেষণা, প্রযুক্তি, পরিবেশগত মূল্যায়ন, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই।
৫০ বছরের মহাপরিকল্পনার প্রস্তাব
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছরের ১১ জুন বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) মোখলেসুর রহমান মিলনায়তনে ‘বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন, কুড়িগ্রাম, বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদব্যবস্থার বালু সম্পদ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে খনিজ প্রযুক্তি, গবেষণা ও শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ২০২৬ থেকে ২০৭৫ সাল পর্যন্ত ৫০ বছরের একটি মহাপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ১৫ একর জমিতে একটি পাইলট রিসার্চ প্ল্যান্ট এবং রাজারহাট উপজেলার টগরাইহাট এলাকায় ১০ একর জমিতে একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রকল্পটির জমি জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক মানের মিনারেল স্যান্ডস রিসার্চ হাব, বিরল মৃত্তিকা মৌল নিয়ে গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, স্কাডা ও স্মার্ট মাইনিং প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং জিওলজিক্যাল বিগ ডাটা সেন্টার স্থাপনের কথা রয়েছে। পাশাপাশি নিউক্লিয়ার-গ্রেড জিরকন ও উচ্চ বিশুদ্ধতার কোয়ার্টজ নিয়ে গবেষণার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনায় বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া টাইটানিয়াম, জিরকোনিয়াম ও বিরল মৃত্তিকা মৌলভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা, আমদানি-নির্ভরতা কমানো এবং খনিজ সম্পদকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক করিডর তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনের বিষয়টি প্রকল্পের বাস্তবায়ন, গবেষণার ফলাফল ও বাণিজ্যিক কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে।
মন্ত্রণালয়ের সভার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্পটি নিয়ে বিভ্রান্তির সূত্রপাত হয় গত ১৯ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক সভার কার্যবিবরণীতে জেলা প্রশাসনের মতামত উল্লেখ করাকে কেন্দ্র করে। ওই সভার ১০ নম্বর আলোচ্য বিষয়ে বলা হয়, কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় সরকারের প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য হবে না বলে অভিমত দেওয়া হয়েছে।
তবে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন তাঁর দপ্তর থেকে পাঠানো হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি যোগদানের আগে সাবেক জেলা প্রশাসকদের সময়ে বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সম্ভাব্য জমির তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
এ ছাড়া কুড়িগ্রাম সদর, চিলমারী ও রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা গত বছরের ৫ মার্চ সম্ভাব্য জমির তথ্য-উপাত্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে এমন পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে আসায় জেলার বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে দ্রুত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।
প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে স্থানীয়রা
জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “সম্ভাবনাময় এই প্রকল্পটি এখনো শুরুই হয়নি। সেখানে কীভাবে কর্তৃপক্ষ বলতে পারে লাভ হবে না, লোকসান হবে? সরকার দেশে অনেক প্রকল্প গ্রহণ করছে। গবেষণা অনুযায়ী, এটি বাস্তবায়িত হলে পুরো দেশের অর্থনীতির চিত্র পরিবর্তন হতে পারে। প্রকল্পটি শুরুর জন্য সরকার কার্যকর ও দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে প্রত্যাশা করছি।”
জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক হাসিবুর রহমান হাসিব বলেন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং খনিজ সম্পদ আহরণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
কুড়িগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় মূল্যবান ও বিরল খনিজ সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদ নিয়ে গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের লক্ষ্যে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে। প্রকল্পের জন্য জমির সম্ভাব্যতা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, তিনি যোগদানের আগে সাবেক জেলা প্রশাসকদের সময়ে বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সম্ভাব্য জমির তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে গত ১৯ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সভায় জেলা প্রশাসকের যে অভিমতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সে ধরনের কোনো প্রতিবেদন তাঁর দপ্তর থেকে পাঠানো হয়নি।
নদীর বালুতে মূল্যবান খনিজের সম্ভাবনা
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) ড. সোহেল রানা বলেন, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর বালু পুনর্ভরণযোগ্য। হিমালয় থেকে কুড়িগ্রাম হয়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বালু আসে।
তিনি বলেন, “আমরা যদি এই বালু ব্যবহার করতে পারি, তাহলে এতে কোয়ার্টজসহ ভারী ও হালকা খনিজ পাওয়া যাবে। ভারী খনিজের মধ্যে রুটাইল, গারনেট, ইলমেনাইট, জিরকন ও মোনাজাইটের মতো মূল্যবান খনিজ রয়েছে। এসব খনিজ পৃথক করা গেলে তা নিয়ে গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ তৈরি হবে। আমরা এ বিষয় নিয়েই কাজ করছি।”
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কুড়িগ্রাম প্রশাসনের বক্তব্যের মধ্যে অসংগতির বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে কোনো জটিলতা থাকলে তা নিরসনে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
কুড়িগ্রামবাসীর প্রত্যাশা, প্রস্তাবিত প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা, অর্থনৈতিক সুফল ও পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে যাচাই করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জেলার কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এমকে/বিএম২৪








