আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা ও নৈতিক শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে: মেয়র শাহাদাত

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম
আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা ও নৈতিক শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে: মেয়র শাহাদাত

সূত্রঃ সংগৃহীত

মো. কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি


চট্টগ্রাম নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা, নৈতিক শিক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।


তিনি বলেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান বা আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নগরীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।


চট্টগ্রাম জেলার আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিশেষ মতবিনিময় সভায় বক্তব্যকালে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।


মেয়র বলেন, নগরীতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার সময় অনেক ক্ষেত্রে জীবিকার তাগিদে ফুটপাত বা সড়কের পাশে ব্যবসা করা মানুষের মুখোমুখি হতে হয়। তাদের উচ্ছেদ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। পুনর্বাসন বা বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না থাকলে একই সমস্যা আবারও তৈরি হতে পারে।


তিনি বলেন, চট্টগ্রাম একটি কসমোপলিটন নগরী। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ জীবিকার সন্ধানে এখানে আসেন। তাই নগর ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।


পরিকল্পিত নগর গড়তে বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মেয়র বলেন, উচ্ছেদ অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে ওই স্থানগুলো স্থায়ীভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় রাখতে হবে। তা না হলে কিছুদিন পর আবারও দখল ও বিশৃঙ্খলা ফিরে আসতে পারে।


আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিভিন্ন কারণ তুলে ধরে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধের পেছনে নৈতিক অবক্ষয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তরুণ ও কিশোরদের নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।


রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু ওপরের স্তরে পরিবর্তন আনলে হবে না; মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমেও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।


নগরীর জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে মেয়র বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে কাজ চলছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে উন্নত ট্রাফিক সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় ক্যামেরাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপনের কাজও এগিয়ে যাচ্ছে।


ডেঙ্গু মোকাবিলায় তথ্যভিত্তিক কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোন এলাকায় কত রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং কোথায় সংক্রমণের হার বেশি—এসব তথ্য সংগ্রহ করে হটস্পট চিহ্নিত করা হচ্ছে। তথ্যের ভিত্তিতে এলাকাগুলোকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে ভাগ করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।


মেয়র বলেন, শুধু জ্বরের চিকিৎসা করলেই হবে না, জ্বরের প্রকৃত কারণও নির্ণয় করতে হবে। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ও টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগের সঠিক কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা, পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই এসব বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কুল হেলথ প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে।


ফুটপাত দখলমুক্ত ও যানজট নিরসনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান মেয়র। জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় তথ্য থাকা ব্যবসায়ীদের তালিকাভুক্ত করে বিভিন্ন এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নাইট মার্কেট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগ্রাবাদ ও চকবাজারে ইতোমধ্যে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।


ফুটপাত ব্যবস্থাপনা ও যানজট নিরসনে রাজনৈতিক দল, পুলিশ প্রশাসন, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান মেয়র।


কর্ণফুলী সেতু এলাকায় যানজট নিয়ন্ত্রণে স্বেচ্ছাসেবকদের কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি সেতুর টোল আদায়ের কারণে যানজটের দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যালোচনার আহ্বান জানান।


চট্টগ্রাম শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল করতে কুলগাঁও এলাকায় একটি বড় বাস টার্মিনাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে মেয়র বলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই এটি উদ্বোধন করা হবে।


তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সিটি করপোরেশন, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ নাগরিক—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগেই নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব।