প্রতিবন্ধী অধিকার ও সামাজিক বাস্তবতা
বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থার দিকে তাকালেই দেখা যায় সমাজে মানুষের মধ্যে ভিন্নতর বাস্তবচিত্রে পার্থক্যের ফারাক। বিশেষ করে "বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন " শিশু থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে সমাজ ব্যবস্থার যেকোনো পর্যায়ে তাকালে প্রায়শই একটি পরিচিত নির্মম দৃশ্য চোখে পড়ে। একটি শিশু বা কিশোর, যার হয়তো পৃথিবীর আলো-বাতাসে ছুটে বেড়ানোর কথা ছিল, কিন্তু বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী মানুষদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে,তারা ঘরের এক কোণে, শিকলবন্দি কিংবা অবহেলার এক নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী। আমাদের সমাজ তাকে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের কাতার গ্রহণ করতে অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে, সমাজে পরিবারগুলোতে দেখা যায় এমন শিশুদের মনে করা হয় আজীবন ‘পাপের ফসল’ বা ‘অর্থনৈতিক বোঝা’। জন্মগতভাবে সীমাবদ্ধতা নিয়ে পৃথিবীতে আসা এই মানুষগুলোর জীবন আমাদের আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার আড়ালে এক চরম মানবিক সংকটের নাম। বাংলাদেশে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষগুলোর অবহেলার বিষয়টি মূলত জড়িয়ে আছে সামাজিক কুসংস্কার এবং দারিদ্রতার সঙ্গে। গ্রাম পর্যায়ে অটিজম, ডাউন সিন্ড্রোম কিংবা যেকোনো শারীরিক প্রতিবন্ধিকাতা সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব , অন্ধ বিশ্বাস মূলত এই বিষয়টিকে আরো সংকটের দিকে নিয়ে যায়। বিশেষ করে একটি দরিদ্র পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, এমন পরিবারগুলোতে একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের নিয়মিত থেরাপি, বিশেষায়িত পুষ্টি বা ওষুধের খরচ চালানোকে পাহাড়সম বোঝা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। ফলে, চিকিৎসার অভাব তো আছেই , অনেক সময় ন্যূনতম পুষ্টিকর খাবার থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হয়। পারিবারিক এই চরম বঞ্চনার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য এদের জীবনকে আরও সংকটময় করে তোলে। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠেনি। মফস্বল বা চরাঞ্চলের সাধারণ স্কুলগুলোতে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য কোনো র্যাম্প নেই, নেই বিশেষ টয়লেটের ব্যবস্থা। সবচেয়ে বড় অভাব আন্তরিক শিক্ষকের, যিনি এই শিশুদের মনস্তত্ত্ব বুঝে পরম যত্নে শিক্ষা দিতে পারেন।ফলশ্রুতিতে এই মানুষগুলো শিক্ষার আলো থেকে ছিটকে পড়ে। বিশেষ করে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ,রংপুর বা রাজশাহী বিভাগের জেলা শহরগুলোতেও উন্নতমানের থেরাপি সেন্টার, স্পিচ থেরাপিস্ট বা শিশু মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। যার চূড়ান্ত ফলাফল গ্রামীণ প্রান্তিক মানুষগুলোর পক্ষে এই ব্যয়বহুল চিকিৎসাসেবা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।নামে মাত্র আমাদের দেশে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’ এবং ‘নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩’ এর মতো চমৎকার সব আইন রয়েছে। বাস্তবিক দিক বিবেচনা করলে দেখা যায় যে মাঠ পর্যায়ে এই আইনের কার্যকারিতা ও সচেতনতা খুবই সীমিত। বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র যে প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান করে, বর্তমান বাজারমূল্যের বাজারে তা একজন মানুষের ন্যূনতম অধিকার বা জীবনধারণের খরচের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। এই সামান্য ভাতা পাওয়ার জন্য প্রতিবন্ধী কার্ড তৈরি করতে গিয়েও অনেক সময় নানামুখী প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা ও দালালদের খপ্পরে পড়তে হয় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে।
এই অন্ধকার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারের উচিত দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজকে বোঝানো প্রতিবন্ধকতা কোনো অভিশাপ নয়, এটি কেবল একটি বিশেষ শারীরিক বা মানসিক অবস্থা।পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেওয়া জেলা -উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে সেবা চালু করা জরুরি। সমাজের এই মানুষগুলোকে শুধু দয়া বা ভাতার ওপর নির্ভরশীল না রেখে, যুগোপযোগী কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। বেসরকারি ও করপোরেট সেক্টরে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন এই মানুষদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা বা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সময়ের দাবি। আমাদের মনে রাখা দরকার ,প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের করুণার পাত্র নন, তারা আমাদেরই ভাই, বোন কিংবা সমাজের অংশ তারাও রাষ্ট্রের নাগরিক সমান অধিকার ভোগের । সঠিক সুযোগ, একটু সহানুভূতি এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তারাও যে সমাজের মূলধারায় অবদান রাখতে পারেন, তার অসংখ্য নজির পৃথিবীতে বিদ্যমান।সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ,কাউকে পেছনে ফেলে, ঘরের কোণে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়।
লেখা:
মোঃ মাহমুদুল হাসান
শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা কলেজ।









