সৌদিতে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ফিরছেন নারী কর্মীরা

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৮ পিএম
সৌদিতে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ফিরছেন নারী কর্মীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক


বিদেশে নির্যাতন, বৈষম্য ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশের শিকার হয়ে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে দেশে ফিরেছেন ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী কর্মী। তাঁদের মধ্যে ৯৭৯ জনই ফিরেছেন সৌদি আরব থেকে। অর্থাৎ, মোট ফেরত আসা নারী কর্মীর প্রায় ৫৮ দশমিক ৬২ শতাংশই সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন।


নারী কর্মীদের দেশে ফিরে আসার ঘটনায় বিদেশে তাঁদের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ এবং বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বহুমুখীকরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি গৃহকর্মের বাইরে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।


সাভারের শিলা বেগম ভাইবোনের খরচ জোগাতে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যান। কিন্তু এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই গত এপ্রিলে দেশে ফিরে আসেন তিনি।


নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শিলা বলেন, সৌদি আরবে তাঁকে দিন-রাত কাজ করতে হতো। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। ঘুমাতে হতো রান্নাঘরে, আর বাসা থেকে বের হওয়ারও সুযোগ ছিল না। এমন পরিস্থিতিকে বন্দিজীবনের সঙ্গে তুলনা করে তিনি জানান, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরে এসেছেন।


প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের আউটপাস প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী কর্মী আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরেছেন। তাঁদের মধ্যে সৌদি আরব থেকে ৯৭৯ জন, জর্ডান থেকে ২২৭ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭৮ জন, ভারত থেকে ৫২ জন এবং মালয়েশিয়া থেকে ৪৮ জন রয়েছেন।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ১২৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৯৭ জন, মার্চে ৩০ জন, এপ্রিলে ২৩৬ জন, মে মাসে ১৬৭ জন, জুনে ১৬৯ জন, জুলাইয়ে ৩৩১ জন, আগস্টে ৩০৯ জন এবং সেপ্টেম্বরে ২২০ জন নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি আরব থেকে ১০৩ জন এবং জর্ডান থেকে ৬৪ জন নারী কর্মী ফেরত আসেন।


সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে প্রত্যাশিত কাজ না পাওয়া, বেতন না পাওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপ, শারীরিক নির্যাতন, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, পারিবারিক জটিলতা, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারাসহ নানা কারণে নারী কর্মীরা দেশে ফিরে আসেন। তাঁদের অনেকে নির্যাতন ও নিপীড়নের অভিযোগও করেন। কেউ কেউ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরেছেন বলেও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।


সৌদিতে নির্যাতনের অভিযোগ


দোহারের জাহানারা বেগমও সৌদি আরবে গিয়েছিলেন নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায়। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ভাইদের পরিবারের ওপর নির্ভরশীল থাকতে না চেয়ে নিজের সম্পদ বিক্রি ও ধারদেনা করে বিদেশে পাড়ি জমান তিনি।


জাহানারা অভিযোগ করেন, সৌদি আরবে তাঁর নিয়োগকর্তা তাঁকে কুপ্রস্তাব দিতেন। এতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরে আসেন তিনি।


শিলা ও জাহানারার মতো অনেক নারী কর্মী বিদেশে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করছেন। আবার কারও কারও মরদেহ দেশে ফিরছে। এসব মৃত্যুর ক্ষেত্রে মৃত্যুসনদে অনেক সময় স্বাভাবিক মৃত্যু কিংবা আত্মহত্যার কথা উল্লেখ থাকে।


অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসা নারী কর্মীদের ৯৪ শতাংশ বিদেশে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং ৮২ শতাংশকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে।


মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আলোচনা


এদিকে সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা চলছে।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বুধবার মক্কার মসজিদ এলাকায় ‘অনৈতিক’ কাজের অভিযোগে নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আক্তার নামে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এ বিষয়ে আগে বাংলাদেশকে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।


ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে চায়। পরে রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়ারের সঙ্গে বৈঠক করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ সময় সৌদি সরকারের কাছে পাঠানো নোট ভার্বালের একটি অনুলিপিও রাষ্ট্রদূতের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।


সৌদিমুখী শ্রমবাজার, বাড়ছে বহুমুখীকরণের প্রয়োজন


বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখনো সৌদি আরবনির্ভর। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। তাঁদের মধ্যে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন সৌদি আরবে গেছেন।


চলতি বছর বিএমইটি থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নেওয়া ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জন কর্মীর মধ্যে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৪৩ জনের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব।


অভিবাসন ও শরণার্থী-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মনে করেন, নারী কর্মীদের জন্য নতুন শ্রমবাজার ও কর্মক্ষেত্র তৈরি করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, গৃহকর্মের পাশাপাশি তৈরি পোশাক, নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে নারীদের কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন।


আসিফ মুনীর বলেন, গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে অনেক নারীকে নিয়োগকর্তার বাসায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে হয়। এতে তাঁদের চলাফেরা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে, যেসব কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ একসঙ্গে কাজ করেন এবং কর্মীদের জন্য আবাসন বা ডরমিটরির ব্যবস্থা থাকে, সেখানে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।


তিনি আরও বলেন, পরিকল্পিতভাবে গৃহকর্মের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প খাতে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। তবে হঠাৎ করে কোনো শ্রমবাজার বন্ধ না করে প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ।


প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, নারী কর্মীদের আইনি সহায়তা দিতে ১৩টি দেশে কার্যক্রম চালু রয়েছে। সৌদি আরবেও নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সেফ হোম রয়েছে। তবে নারী কর্মীদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি স্বীকার করেন।


উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ১৯৯১ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে নারী কর্মী পাঠানো শুরু করে। নির্যাতনের অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করার পর ২০১৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি হয়। এরপর থেকে দেশটিতে বাংলাদেশি নারী কর্মী পাঠানো অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের অভিযোগে সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধের দাবিও উঠেছে।


এমকে/বিএম২৪