টানা তিন বছর সূর্যগ্রহণ দেখবে স্পেন
সূত্রঃ সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
স্পেনে টানা তিন বছর বিরল সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আজ ১৩ আগস্ট স্থানীয় সময় বিকেলে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। এরপর ২০২৭ সালের আগস্টে পূর্ণগ্রাস এবং ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণও দেখা যাবে স্পেন থেকে।
বুধবারের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ উত্তর-পশ্চিম স্পেনের গালিসিয়া থেকে পূর্বে বালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় দৃশ্যমান হবে। একই গ্রহণ গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চল থেকেও দেখা যাবে।
আগামী বছর ২০২৭ সালের ২ আগস্ট দক্ষিণ স্পেনের সীমান্তবর্তী অঞ্চল, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি অংশ থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। এর পরের বছর ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে স্পেনের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাওয়ার কথা রয়েছে।
বার্সেলোনা অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সভাপতি হোসেপ মাসাইয়েস বহু বছর ধরে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করছেন। ১৭ বছর বয়সে বার্সেলোনার আকাশে প্রথম সূর্যগ্রহণ দেখার পর এ বিষয়ে তার আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর গত ৫৩ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে তিনি ৪৩টি সূর্যগ্রহণ দেখেছেন, যার মধ্যে ২২টি ছিল পূর্ণগ্রাস।
মাসাইয়েসের মতে, সূর্যগ্রহণের সৌন্দর্য অতুলনীয়। এই আগ্রহ তাকে বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের নানা প্রান্তের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। টানা তিন বছরের গ্রহণ পর্যবেক্ষণে এবার স্পেনের পাশাপাশি মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া ও মিসরেও যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন তিনি।
পূর্ণগ্রাস ও বলয়গ্রাস গ্রহণ
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি আড়াল করে দেয়। ফলে পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকায় দিনের বেলাতেও অন্ধকার নেমে আসে এবং সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল ‘করোনা’ খালি চোখে দেখা সম্ভব হয়।
অন্যদিকে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ পৃথিবী থেকে তুলনামূলক দূরে থাকায় সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারে না। তখন সূর্যের চারপাশে আগুনের বলয়ের মতো উজ্জ্বল একটি বৃত্ত দেখা যায়।
প্রতি বছর সাধারণত দুই থেকে তিনটি সূর্যগ্রহণ হলেও বেশিরভাগই সমুদ্র বা জনবসতিহীন এলাকায় ঘটে। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণও তুলনামূলকভাবে বিরল। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার বিজ্ঞান, যোগাযোগ ও শিক্ষা বিভাগের প্রধান সান্দ্রা বেনিতেজের মতে, দেড় বছরের মধ্যে স্পেন থেকে তিন ধরনের সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
আইবেরীয় উপদ্বীপে ১৯১২ সালের পর আর পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়নি। আবার ২০২৭ সালের পর ২০৫৩ সাল পর্যন্ত ইউরোপের কোনো অংশে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
বিজ্ঞানীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ
সূর্যগ্রহণ শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বিজ্ঞানীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ণগ্রাসের সময় সূর্যের করোনা পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাওয়া যায়। এই অঞ্চল থেকেই সৌর বায়ু ও সৌরঝড়ের উৎপত্তি হয়, যা পৃথিবীর ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
শক্তিশালী সৌরঝড়ের কারণে স্যাটেলাইট, মোবাইল যোগাযোগ, জিপিএস, বিদ্যুৎ গ্রিড ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায়ও সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই মহাকাশ আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও পর্যবেক্ষণ দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এ কাজে ভূমিকা রাখছে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার প্রোবা-৩ ও সোলার অরবিটারের মতো মহাকাশ মিশন। মাটিতে পরিচালিত পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মহাকাশযান থেকে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা সৌরঝড়ের ঝুঁকি বোঝার চেষ্টা করছেন।
তবে সূর্যগ্রহণের আরেকটি বড় গুরুত্ব হলো বিজ্ঞান শিক্ষায়। এ ধরনের বিরল ঘটনা শিশু-কিশোরসহ সাধারণ মানুষকে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশবিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে।
২০২৭ সালের গ্রহণ ঘিরে বড় প্রস্তুতি
২০২৭ সালের ২ আগস্টের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণকে ইতোমধ্যে ‘শতাব্দীর গ্রহণ’ বলা হচ্ছে। মিসরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় এর পূর্ণগ্রাস পর্যায় ছয় মিনিটেরও বেশি স্থায়ী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই গ্রহণ পর্যবেক্ষণে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ অ্যাস্ট্রোফিজিক্স ইনস্টিটিউট সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একটি গবেষণা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। মরক্কোর মোহাম্মদ সিক্সথ পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি ও যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরিও এতে যুক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া ‘নর্থ আফ্রিকান টেলিস্কোপ ইক্লিপস’ প্রকল্পের মাধ্যমে স্পেন, মরক্কো ও যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী এবং শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে কাজ করবেন। উত্তর মরক্কোর ১০টি স্থান থেকে টেলিস্কোপের মাধ্যমে সূর্যের করোনা পর্যবেক্ষণ ও ছবি সংগ্রহ করা হবে। পরে এসব ছবি একত্র করে সূর্যের বায়ুমণ্ডলে সংঘটিত ঘটনাগুলোর একটি বিস্তৃত চিত্র তৈরি করা হবে।
গবেষক ইউসেফ মুলানের কাছে ২০২৭ সালের এই গ্রহণের গুরুত্ব অনেক গভীর। বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও এতে যুক্ত করার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তোলাই প্রকল্পগুলোর অন্যতম লক্ষ্য।
২০২৭ সালের বড় আয়োজনের প্রস্তুতি হিসেবে একদল শিক্ষার্থী ২০২৬ সালের গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করতে উত্তর স্পেনে ভ্রমণ করবে।
এমকে/বিএম২৪








