আদান গ্রুপের পাওনা ৪৬৪ মিলিয়ন ডলার: প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ চাইলেন গৌতম আদানি

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর ২০২৫, ০৩:৩৯ পিএম
আদান গ্রুপের পাওনা ৪৬৪ মিলিয়ন ডলার: প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ চাইলেন গৌতম আদানি

ডেস্ক রিপোর্ট:

ভারতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তিনি আদানি পাওয়ারের গোড্ডা তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে সরবরাহকৃত বিদ্যুতের বিপরীতে পাওনা ৪৬৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা) দ্রুত পরিশোধে জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

চিঠিতে আদানি উল্লেখ করেন, পাওনা অর্থ পরিশোধে দীর্ঘসূত্রিতা প্রতিষ্ঠানটির ঋণদাতা সংস্থা ও অংশীদারদের মধ্যে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করছে। তিনি বলেন, “এই বকেয়া পরিশোধে বিলম্ব আমাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং অংশীদারদের আস্থা উভয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।”

চিঠিটি প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এ বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে এবং আদানি পাওয়ারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, “গত জুলাই মাসে আদানির সব বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছিল। এরপর নতুন করে আবারও এই পরিমাণ অর্থ বকেয়া পড়েছে।”

একই বছরে দুই দফায় বড় অংকের অর্থপ্রদান:

চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত আদানি পাওয়ারের ৪৩৭ মিলিয়ন ডলার বকেয়া একবারে পরিশোধ করেছিল বাংলাদেশ, যা এখন পর্যন্ত আদানির সবচেয়ে বড় এককালীন অর্থপ্রাপ্তি। এর আগে প্রতি মাসে আদানি গড়ে ৯০–১০০ মিলিয়ন ডলার পেয়ে আসছিল। নতুন করে আরও ৪৬৪ মিলিয়ন ডলার বকেয়া জমেছে বলে জানা গেছে।

চিঠিতে গৌতম আদানি আরও দাবি করেন, গত ২৩ জুন পিডিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বকেয়া ও লেট পেমেন্ট সারচার্জসহ সব অর্থ ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিশোধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনো কোনো চূড়ান্ত সময়সূচি বা পরিশোধ পরিকল্পনা জানানো হয়নি।

বিদ্যুৎ উপদেষ্টার অবস্থান:

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, “এটি নীতিগত কোনো সমস্যা নয়, বরং এন্টারপ্রাইজ লেভেলের বিষয়। পিডিবি কাজ করছে, আমাদের পক্ষ থেকে কোনো চিন্তা নেই।”

চুক্তি নিয়ে পুরনো বিরোধ ও মূল্যবিতর্ক:

উল্লেখ্য, পিডিবি ও আদানির মধ্যে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে কয়লার দামের সূত্র এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইউনিট খরচ নিয়ে বিরোধ এখনো অমীমাংসিত। গত জুনে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে পিডিবি আদানির কয়লার মূল্য নির্ধারণের সূত্র পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার প্রস্তাব দেয়, যা আদানি বিদ্যমান চুক্তির শর্তের কথা বলে প্রত্যাখ্যান করে।

একই বৈঠকে আদানি প্লান্টের নির্ভরযোগ্য উৎপাদন ক্ষমতা (ডিপেন্ডেবল ক্যাপাসিটি) সংশোধনের অনুরোধ জানানো হয়। পিডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আদানি যদি বিতর্কিত শুল্ক পর্যালোচনায় সম্মত হয়, তাহলে শীতকালে ভারতীয় বাজারে বিদ্যুৎ বিক্রির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।

আইনি পদক্ষেপের সুপারিশ ও চুক্তি পর্যালোচনা:

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আদানির সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই বিদ্যুৎচুক্তি নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দেয়। চুক্তিটি উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়াই সম্পাদিত হওয়ায় এবং এতে বাংলাদেশের স্বার্থের প্রশ্নে সমালোচনা ওঠায়, বর্তমান সরকার অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে।

এই কমিটি আদানি এবং আরও সাতটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করেছে। কমিটি সুপারিশ করেছে, আন্তর্জাতিক চুক্তি হিসেবে এই চুক্তি পুনর্বিবেচনার জন্য পিডিবি যেন সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক সালিশ কেন্দ্র (SIAC)-এ আইনি পদক্ষেপ নেয়।

চুক্তির পটভূমি:

২০১৭ সালে ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা জেলায় ১ হাজার ৪৯৮ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য আদানির সঙ্গে চুক্তি করে তৎকালীন সরকার। একই বছর আদানির সঙ্গে ২৫ বছরের জন্য বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি স্বাক্ষর করে পিডিবি।

বিদ্যুৎ গ্রিড কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল (৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টায় আদানি পাওয়ার গোড্ডা প্রকল্প থেকে ১,২৬৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পেয়েছে বাংলাদেশ।