হত্যা মামলা না কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা? চারঘাটে বাদী–আসামির মুখোমুখি লড়াই

প্রকাশিত: ০৯ অক্টোবর ২০২৫, ০৯:২৫ এএম
হত্যা মামলা না কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা? চারঘাটে বাদী–আসামির মুখোমুখি লড়াই

ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী প্রতিনিধি:

রাজশাহীর চারঘাটে ১৬ বছর আগের এক হত্যা মামলাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও সংবাদ সম্মেলনের লড়াই। মামলার বাদী ও আসামি দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, ষড়যন্ত্র এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন।

বুধবার (৮ অক্টোবর) সকালে চারঘাট থানা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে মামলার জামিনে থাকা আটজন আসামি নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তাঁদের অভিযোগ, তাঁরা বিএনপির নেতা-কর্মী হওয়ায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে তাঁদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়।

লিখিত বক্তব্যে মামলার ১৪ নম্বর আসামি ও রায়পুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাজদার রহমান বলেন, “২০০৯ সালের ৬ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডে দু-একজন জড়িত থাকলেও আমাদের আটজনকে রাজনৈতিক কারণে ফাঁসানো হয়েছে। আমরা বিএনপি করি বলেই তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের নির্দেশে আমাদের আসামি করা হয়।”

তিনি আরও দাবি করেন, “ঘটনার দিন আমি স্কুলে ক্লাস নিচ্ছিলাম। তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আবু সাঈদ চাঁদ বিষয়টি জানতেন এবং নিরপরাধদের অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন।”

আরেক আসামি ইমদাদুল ইসলাম বলেন, “এই মিথ্যা মামলার কারণে আমার সংসার ভেঙে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকার থাকাকালে ভয়ে কলেজেও যেতে পারিনি।”

বাদীর পাল্টা অভিযোগ: ‘চাঁদ টাকার বিনিময়ে চাপ দিয়েছে’

এর দুদিন আগে, সোমবার রাজশাহী সিটি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন মামলার বাদী রঞ্জু আহমেদ।

তিনি বলেন, “এটি দুটি পরিবারের জমি ও বিরোধের জের ধরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড। মামলায় কোনো রাজনৈতিক বিষয় নেই। এখন আসামিরা রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে মামলা প্রত্যাহারের চেষ্টা করছে।”

রঞ্জুর দাবি, “জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ আসামিদের পক্ষে ‘জোর সুপারিশ করছি’ লিখে আবেদন দিয়েছেন এবং টাকার বিনিময়ে মামলা প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। প্রথমে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত ইউপি চেয়ারম্যান ৯ বিঘা জমির বিনিময়ে আপসের প্রস্তাব দেন। রাজি না হওয়ায় সম্প্রতি চাঁদ নিজে আমাদের বাড়িতে এসে ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে মামলা তুলে নিতে চাপ দেন।”

চাঁদের বক্তব্য: ‘নির্দোষদের পক্ষে সুপারিশ করেছি’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ বলেন, “আমি যাঁদের পক্ষে সুপারিশ করেছি, তাঁরা বিএনপির কর্মী এবং হত্যার সময় কর্মক্ষেত্রে ছিলেন—এটা এলাকায় সবাই জানে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁদের আসামি করা হয়েছে।”

মামলার পটভূমি

২০০৯ সালের ৬ অক্টোবর রাজশাহীর চারঘাটের রায়পুর বাজারে যাওয়ার পথে হামলার শিকার হন বাদী রঞ্জু আহমেদ। তাঁর ভাই মনিরুল ইসলাম মন্টু ও বাবা শামসুল হক তাঁকে বাঁচাতে গেলে হামলাকারীরা তাঁদেরও আক্রমণ করে। এতে গুরুতর আহত মন্টু হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।

সেদিনই রঞ্জু ২২ জনকে আসামি করে চারঘাট থানায় হত্যা মামলা করেন।

মামলাটি বর্তমানে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন, যেখানে যুক্তিতর্কের শুনানি আগামী ১৪ অক্টোবর নির্ধারিত রয়েছে।

বাদী ও আসামিপক্ষের পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলনের পর মামলাটি আবার আলোচনায় এসেছে।

এখন চারঘাটবাসীর একটাই প্রত্যাশা—আদালতের রায়ের মাধ্যমে ১৬ বছর আগের এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উদঘাটন হবে।