রাবিতে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন: সভাপতির অপসারণ দাবিতে উত্তপ্ত বিভাগ
ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী প্রতিনিধি:
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগে টানা তৃতীয় দিনের মতো চলছে শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) সকাল থেকে বিভাগের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেন। পরে বেলা ১টার দিকে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
বিভাগীয় সভাপতি অধ্যাপক ড. এনামুল হকের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা এখন তাঁর অপসারণও দাবি করছেন। ফলে বিভাগটিতে ক্লাস ও পরীক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
তিন দফা দাবি:
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের তিন দফা মূল দাবি হলো—
১. বৈষম্যমূলক শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিল ও আগের নিয়ম পুনর্বহাল করা।
২. চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ ভাতা চালু করা।
৩. বিসিএস পরীক্ষায় চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিষয়কে টেকনিক্যাল ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করা।
তাদের অভিযোগ, বিভাগের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে পূর্বে শুধুমাত্র চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা আবেদন করতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান সভাপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই শর্ত পরিবর্তন করে সাধারণ মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদেরও আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়—যা শিক্ষার্থীদের কাছে “বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক” বলে মনে হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ:
২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাইসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, “আমরা তিন দিন ধরে আন্দোলন করছি, কিন্তু সভাপতি স্যার আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনাই করেননি। এমনকি আমাদের ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শেষ হলেও তিনি কোনো উদ্যোগ নেননি।”
মাস্টার্স শিক্ষার্থী ফারহানা জেবিন লিজা বলেন, “আমরা উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছি। কিন্তু চেয়ারম্যান স্যার এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেননি। এজন্য আজ আমরা তাঁর অপসারণ দাবি করছি।”
আরেক শিক্ষার্থী সুমন মিয়া অভিযোগ করে বলেন, “আমরা পিএসসিতে স্মারকলিপি পাঠাতে গেলে স্যার স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন। এ ধরনের আচরণ আমাদের প্রতি অসহযোগিতা ছাড়া আর কিছু নয়।”
অভিযোগ অস্বীকার করে বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এনামুল হক বলেন, “আমি শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করছি। ইতোমধ্যে তাদের একটি দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে উপাচার্যের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছেন।”
তিনি আরও জানান, শিক্ষক নিয়োগ এবং ইন্টার্নশিপ ভাতা প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনাও চলছে এবং খুব শিগগিরই ইতিবাচক সমাধান আসবে বলে আশা করছেন।
পটভূমি:
এর আগে মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) শিক্ষার্থীরা প্রথম দফায় বিভাগে তালা ঝুলিয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা দেন এবং উপাচার্য বরাবর লিখিত স্মারকলিপি দেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই কর্মসূচি অনির্দিষ্টকালের জন্য চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজের একাংশের মতে, বিষয়টি দ্রুত সমাধান না হলে এটি রাবির একাডেমিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান একটি স্পেশালাইজড ক্ষেত্র। যদি এখানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিভ্রান্তি বা পক্ষপাতিত্ব দেখা দেয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের আস্থা নষ্ট হবে এবং ভবিষ্যৎ নিয়োগ প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।”
বর্তমানে বিভাগীয় ভবনজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার আশ্বাস দিলেও, আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন—দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।









