রাজশাহী-ঢাকা বাস যাত্রায় সংকটের ছায়া: মজুরি ঝগড়ায় শ্রমিক-মালিকের ঠেলাঠেলি, হাজারো যাত্রীর দুর্ভোগের গল্প

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৯:২৫ পিএম
রাজশাহী-ঢাকা বাস যাত্রায় সংকটের ছায়া: মজুরি ঝগড়ায় শ্রমিক-মালিকের ঠেলাঠেলি, হাজারো যাত্রীর দুর্ভোগের গল্প

ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট,  রাজশাহী প্রতিনিধি:

শিরোইল বাস টার্মিনালের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে মেরিনা বেগম (৪৫) ঘাম মুছছেন। ঢাকায় যাওয়ার টিকিট কাটতে দুপুর ১২টায় এসেছেন, কিন্তু কাউন্টারগুলো বন্ধ। শুধু একতা পরিবহন চলছে, যেখানে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে গরমে কষ্ট হচ্ছে। “বাস না চললে কাজ হবে না, পরিবার অপেক্ষা করছে,” বলেন তিনি। এই দৃশ্য রাজশাহী-ঢাকা রুটের সাধারণ চিত্র—গত দুই মাসে তিন দফা শ্রমিকদের কর্মবিরতির পর মালিকরা বৃহস্পতিবার রাত থেকে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে হাজারো যাত্রী দুর্ভোগে পড়েছেন, যা শুধু যাত্রা ব্যাহত করেনি, অর্থনীতি এবং শ্রমিক অধিকারের একটা গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিয়েছে।

সন্ধানের মূল: মজুরি ঝগড়ার ফাঁদে আটকে যাওয়া রুট

রাজশাহী-ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দাবিতে গত দুই মাসে তিন দফা কর্মবিরতি হয়েছে, যা যাত্রীদের দৈনিক ৫০,০০০-এরও বেশি যাত্রীকে প্রভাবিত করেছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি করে প্রায় ১ কোটি টাকা। bdnews24.com-এর প্রতিবেদন অনুসারে, শ্রমিকরা একতা পরিবহনের মতো মডেলে বেতন (চালকের জন্য যাত্রায় ১,৭৫০ টাকা) চাইছেন, কিন্তু ন্যাশনাল, হানিফ, গ্রামীণ, দেশ ট্রাভেলস ১৫ বছর ধরে ১,২৫০ টাকা দিচ্ছে। মালিকরা ‘অযৌক্তিক’ বলে দাবি প্রত্যাখ্যান করে বাস বন্ধ করেছেন। Dhaka Tribune-এর ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সোমবারের কর্মবিরতি ৩৬ ঘণ্টা চলেছে, যা যাত্রীদের লম্বা অপেক্ষা এবং বিকল্প যানের খরচ বাড়িয়েছে। The Daily Star-এর তথ্যমতে, এই রুটে দৈনিক ২০০+ বাস চলে, যা বন্ধ হলে যাত্রীরা একতা বা আঞ্চলিক বাসে ভিড় করে। শ্রমিক নেতা রফিকুল ইসলাম পাখির মতে, দুই দিনের যাত্রায় ১,২৫০ টাকায় সংসার চলে না—হোটেল বিল (১৫০ টাকা) এবং বিনামূল্যে টিকিটের দাবি যৌক্তিক। মালিক নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, এগুলো লোকসানের কারণ। জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার মধ্যস্থতা করছেন।

শ্রমিক-মালিকের ঠেলাঠেলি: ১৫ বছরের অবিচারের গল্প

শ্রমিকদের দাবি: রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্যমতে, চালকরা ১৫ বছর ধরে একই বেতন পাচ্ছেন, যখন জ্বালানি দাম ৫০% বেড়েছে। একতা পরিবহনের মডেলে চালক ১,৭৫০ টাকা, সুপারভাইজার ৭৫০, হেল্পার ৭০০ পান—যা অন্য কোম্পানিগুলোর তুলনায় ৩০% বেশি। New Age-এর ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে, কর্মবিরতির পর বেতন বাড়ানোর চুক্তি হয়েছে, কিন্তু মালিকরা ‘অতিরিক্ত দাবি’ (হোটেল বিল, মোবাইল ভাতা, বিনামূল্যে টিকিট) প্রত্যাখ্যান করে বাস বন্ধ করেছেন।

মালিকদের যুক্তি: পরিবহন মালিক সমিতির নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, বেতন বাড়ানোর পর শ্রমিকরা অযৌক্তিক দাবি করেছে, যা লোকসানের। বাস ভাড়া নিয়ন্ত্রণে (ঢাকা-রাজশাহী ৮০০ টাকা) লাভ কম, জ্বালানি খরচ বেড়েছে। ২০২৪-এ জ্বালানি দাম ২৫% বেড়েছে, কিন্তু ভাড়া অপরিবর্তিত।

যাত্রীদের দুর্ভোগ: TBS News-এর ২২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে, কর্মবিরতিতে হাজারো যাত্রী আটকে পড়েছে—লম্বা লাইন, গরমে কষ্ট, বিকল্প যানের ভাড়া ২০% বেড়েছে। মেরিনা বেগমের মতো গৃহবধূরা পরিবারের জন্য চিন্তিত। নাসিম আহমেদ বলেন, অ্যাপে একতার টিকিট কাটা গেছে, কিন্তু বিলম্ব। ইফতিখার আলম রকি যোগ করেন, “দুপুর ১২টার টিকিট ২টায় যাচ্ছে, গরমে অসুস্থ লাগছে।” একতা জেনারেল ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম সুমন বলেন, “৩২টি বাস চলছে, কিন্তু চাপে সার্ভিস ব্যাহত।”

যাত্রীদের জন্য সহায়ক টিপ0স: সংকটকালীন যাত্রা গাইড

এই ঝগড়া যাত্রীদের জন্য কষ্টের, কিন্তু কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যায়:

বিকল্প যান: একতা পরিভান (অ্যাপ: Shohoz) বা আঞ্চলিক বাস (হান্স, সৌকাত) ব্যবহার করুন। ট্রেন (রাজশাহী-ঢাকা: ৪ ঘণ্টা, ভাড়া ৫০০ টাকা) বা বইজাকরাইকরা (অ্যাপ: Pathao) চেক করুন।

টিকিট বুকিং: Shohoz বা bdtickets.com অ্যাপে অগ্রিম বুক করুন; অফলাইনে শিরোইল টার্মিনালে সকাল ৬টায় যান।

যাত্রী অধিকার: BRTA হটলাইন (১৬২২২) বা DC অফিস (০৭২১-৭৭০০১) কল করুন যদি বিলম্ব হয়।

নিরাপত্তা: অটো/বাসে ওভারলোড এড়ান, মাস্ক ব্যবহার করুন (কোভিডের পরেও ঝুঁকি)।

শ্রমিক অধিকার সচেতনতা: শ্রমিকরা ন্যায্য বেতন চাইছেন—এটি সমর্থন করে স্থায়ী সার্ভিস নিশ্চিত করুন।

এই সংকটের সমাধানে মধ্যস্থতা জরুরি। জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার বলেছেন, “দুই পক্ষকে নিয়ে কথা বলে ব্যবস্থা নেব।”

 বিশেষজ্ঞরা (সুপারিশ করেছেন: BRTA-র মাধ্যমে বেতন কমিটি গঠন, ভাড়া বাড়ানো (জ্বালানি খরচ মেটাতে), এবং শ্রমিক-মালিক চুক্তির জন্য মধ্যস্থতা। যদি সমাধান না হয়, যাত্রীরা ট্রেন/ফ্লাইট (রাজশাহী এয়ারপোর্ট থেকে) বিবেচনা করুন। এই ঝগড়া শ্রমিক অধিকারের লড়াই—যাত্রীরা এতে জড়িয়ে পড়ে স্থায়ী পরিবহন নিশ্চিত করতে পারেন। না হলে, রাজশাহী-ঢাকার রাস্তা আরও অশান্ত হবে।