তৃতীয় পক্ষ কলমে: অনিকেত
একদা এক গ্রামে রাতুল, নীরব ও ফয়সাল নামে তিন যুবকের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। তারা একত্রে বসবাস এবং রাতবেরাত একে অপরকে আগলে চলাফেরা করতো। এক কথায়, তারা একই বৃন্তে তিনটি ফুল। হঠাৎ একটি মেয়েকে কেন্দ্র করে তাদের মাঝে তুমুল ঝামেলা লেগে গেল! তাদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান এবং তীব্র আক্রোশ চলাকালীন হুট করেই একদিন রাতুলের লাশ পাওয়া গেলো পাশের গ্রামের খোলা মাঠে! পুলিশ এসেই ধরে নিয়ে গেল নীরব আর ফয়সালকে!
তারা কারাগারে বন্দী জীবন পার করছে। এদিকে মামলা আদালতে উঠলো সঠিক বিচারের জন্য। জজ সাহেব বিচারকার্য শুরু করে, উপরি উক্ত ঘটনার জের ধরে নীরব ও ফয়সালকে প্রাণদণ্ড প্রদান করলেন! হঠাৎ, কাঠগড়ার এক কোণা থেকে মাথার ক্যাপ খুলে, একজন তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা মহামান্য আদালতের কাছে কিছু বলার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলেন। আদালত অনুমতি প্রদান করলে, তিনি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মামলা পুনঃতদন্তের জন্য সময় চাইলেন। জজ সাহেব কলম কামড়ে এবং আসামি পক্ষের আইনজীবীর অনুরোধে সময় প্রদান করলেন। নবীন পুলিশ কর্মকর্তা নীরব এবং ফয়সালের দিকে তাকাতেই তারা অঝোরে কেঁদে ফেললো!
সে যাহোক, প্রলয় সিনেমার অনিমেষ দত্তের মতো রাতের ঘুম হারাম করে, অফিসার একের পর এক ক্লু খুঁজতে লাগলেন! ইতোমধ্যে, সময়ও শেষ হয়ে আসছে! অফিসার শুধু পথে-প্রান্তে কিংবা, ভয়ংকর নিশীথেও ছুটতে থাকলেন! হঠাৎ একদিন, ভাগ্য সহায় হলো! রাত ১২টার দিকে তিনি নির্জন একটি মাঠ পেরিয়ে, বাসায় ফিরছিলেন। কিছুদূর আসতেই একটি টং চায়ের দোকান দেখে বাইক থামালেন। তিনি বাইক থেকে নামতেই দোকানী ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন! অফিসার চায়ের কাপে চুমুক দিতেই দোকানের পেছন থেকে হা হা শব্দ ভেসে উঠলো! দোকানটি সম্পর্কে অফিসারের কাছে আগে থেকেই কিছু তথ্য জমা ছিল।
এদিকে দোকানী মাইনকা চিপায় পড়ে চুপ হয়ে আছেন। অফিসারও কোন কথা না বলে দোকানীকে অবজারভ্ করছেন। হঠাৎ, রাতুল নামটি শব্দবোমা হয়ে পেছন থেকে ভেসে আসলো! দোকানের পেছনে রাতুল হত্যার বীভৎস কাহিনীর বর্ণনা চলছে! অফিসার এবার কোমরে হাত দিয়েই, এক ঝাঁপে দোকানের পেছনে গিয়েই একটাকে ধরে, গগনবিদারী ফাঁকা আওয়াজ ছুঁড়ে দিলেন। মুহুর্তেই দোকান খালি! হাতে রইলো শুধু একজন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফোর্স আসলো। থানা হাজতে আসামিকে নিয়েই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলো।
অফিসার তীব্র কৌতুহলে শুধু ঘামছেন! কয়েকদিন ধরে নীরব এবং ফয়সালকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের রাতুল হত্যার পরিকল্পনা কিছুটা হলেও জানতে পেরেছেন অফিসার। কিন্তু, খুন তারা করেনি! সামান্য কারণে বন্ধুকে হত্যার সকল ছক তারা আঁকলেও, শেষ পর্যন্ত খুন তারা করতে পারেনি।
অফিসার ভাবছে, রাতুলকে তাহলে মারলো কারা?
গভীর কৌতূহল নিয়ে অফিসার আসামি কক্ষে ঢুকলেন। দোকান থেকে তুলে নিয়ে আসা বদমাশটার পশ্চাৎদেশে কয়েক ঘা দিতেই মূল কাহিনী বেরিয়ে আসলো। কিন্তু খুন নাকি এরাও করেনি! অফিসার আবারও ভ্রু কুঁচকালেন। মারলো কারা? আসামির দেওয়া বর্ণনা মতে দোকান থেকে পালিয়ে যাওয়া , বাকিদেরও ধরে আনা হলো। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসলো এক লোমহর্ষক চিত্রকল্প!
মূলত, এরা ছিল রাতুল হত্যার সহযোগী এবং মাদকসেবী একটা গ্যাঙ্ মাত্র। তাহলে মূলে কে? অফিসার এবার চেয়ারে বসে, টেবিলে পা উঠালেন। পকেট থেকে সিগারেট বের করে একটা লম্বা টান দিলেন। এ যেন ভাবনার গভীরে ডুব দেওয়া!
কিছুক্ষণ পর অফিসার আবারও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। আসামিরা একে একে তুলে ধরলো সব কাহিনী। আসলে, ঐ দোকানটাতে মাদক সেবন চলতো। তাই, মাদকসেবীদের নিয়মিত আসা-যাওয়া হতো সেখানে। রাতুল কোন একদিন ঐ দোকানে ঝামেলা বাঁধিয়েছিল। ফলে, তারপর উপরে একটা কিশোর গ্যাঙের বিরাট ক্ষোভ ছিল, যা অনেকেই ভুলে গিয়েছিল।
তাহলে, রাতুলকে কি কিশোর গ্যাঙই মেরেছে?
না। আসলে, ঐ দোকানী মাদকের সাপ্লায়ার ছিল। রাতুলের সাথে ঝামেলার পর দোকানীর ব্যবসায় ধ্বস নেমেছিল। আর, রাতুল সরাসরি ঐ দোকানীর অপকর্মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল।
তবে কি মূল আসামি দোকানী?
অফিসার দোকানীকেও তুলে আনলেন। টানা জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে দোকানী স্বীকার করলো সবকিছু। ঐ এলাকার একজন প্রভাবশালী নেতার ইশারায় দোকানটিতে সকল অপকর্ম চলতো। রাতুল মূলত, ঐ নেতার জন্য অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছিল! রাতুলের জন্য ঐ নেতার সব ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই, গলার কাঁটা রাতুলকেই সে সরিয়ে দিল পৃথিবী থেকে! এক্ষেত্রে, দোকানী-কিশোর গ্যাঙের ছেলেগুলো হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করেছে।
অফিসার নিকোটিনে আরেকবার বুদ হয়ে, নেতাকেও তুলে আনলেন। বেদম পিটানির এক পর্যায়ে তার পোষা খুনিগুলোকেও ধরে আনা হলো।
অতঃপর, অফিসার তাঁর রিপোর্ট লেখা শেষ করলেন। বেচারা নীরব এবং ফয়সাল ভয়ংকরভাবে ফেঁসে যাওয়া থেকে বাঁচলো বটে। কিন্তু, সাজা তাদেরও হলো কিছুটা। অফিসার লম্বা একটা শ্বাস ছেড়ে আবারও নিকোটিনে বুদ হলেন।
দেশ সেরা পত্রিকাগুলো হেড লাইন দিল,
চাচার হাতে ভাতিজা খুন।
কী ভাবছেন! নেতা তাহলে রাতুলেরই চাচা!
উত্তরে বলবো, পৃথিবী তো এমনই!...
লেখক:
মোঃ আসাদুজ্জামান








