রাজশাহীতে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবসে কুকুর-বিড়ালের বিনামূল্যে টিকাদান: সমাজে রোগ ছড়ানো রোধে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী প্রতিনিধি:
বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস উপলক্ষে রাজশাহীতে নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে, যার মধ্যে কুকুর-বিড়ালের বিনামূল্যে টিকাদান সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। রবিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আয়োজনে র্যালি, আলোচনা সভা এবং টিকাদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এই কর্মসূচি সমাজে জলাতঙ্কের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রাণী টিকাদানের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে রোগ ছড়ানো রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশে বার্ষিক প্রায় ২,০০০ মানুষ জলাতঙ্কে মারা যান, যার ৯৯% কুকুরের কামড় থেকে হয়, এবং প্রাণী টিকাদান এই সংখ্যা ৫০% পর্যন্ত কমাতে সক্ষম।
সকাল ১০টায় রাজশাহী মেট্রো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাঙ্গণ থেকে র্যালি বের হয়, যা নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এতে অংশ নেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, খামারি, পশুপ্রেমী, প্রাণী চিকিৎসক এবং সাধারণ মানুষ। র্যালি শেষে অধিদপ্তরে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলার সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম। বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এফএএম আঞ্জুমান আরা বেগম। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ডা. এসএম কামরুজ্জামান। সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতোয়ার রহমান। সভায় জলাতঙ্কের প্রতিরোধে প্রাণী টিকাদানের গুরুত্ব এবং ‘অ্যাক্ট নাউ: ইউ, মি, কমিউনিটি’ থিম নিয়ে আলোচনা হয়।
সভার পর অধিদপ্তরের উদ্যোগে শতাধিক কুকুর ও বিড়ালকে বিনামূল্যে জলাতঙ্ক টিকা দেওয়া হয়। এই টিকাদান মানুষের মধ্যে জলাতঙ্ক ছড়ানো রোধে সরাসরি ভূমিকা পালন করে, কারণ কুকুর-বিড়ালের ৭০% ভ্যাকসিনেশন মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি ৫০% কমাতে পারে। বাংলাদেশে ২০১১ সাল থেকে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ ধরনের টিকাদান চালু হয়েছে, যা ২০১০ সালের ২,০০০ মৃত্যু থেকে ২০১৫ সালে ২০০-এ নামিয়েছে।
সমাজে প্রভাব: জলাতঙ্কের ভয়াবহতা ও টিকাদানের উপকারিতা
জলাতঙ্ক বাংলাদেশে বার্ষিক ২,০০০ মানুষের মৃত্যুর কারণ, যার ৯৬% কুকুরের কামড় থেকে হয় এবং শিশু-কিশোররা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। এটি শুধু মৃত্যু নয়, অর্থনৈতিকভাবে বার্ষিক ৩৩ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করে, কারণ পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস (পিইপি) চিকিৎসা খরচে ২ লাখ মানুষ প্রতি বছর ৫০,০০০ ডলার খরচ হয়। সমাজে এর প্রভাব ভয়াবহ: পরিবার ধ্বংস, শ্রমশক্তি হ্রাস এবং গ্রামীণ এলাকায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়।
তবে, কুকুর-বিড়ালের টিকাদান অত্যন্ত কার্যকর। এটি মানুষের মধ্যে জলাতঙ্ক ছড়ানো ১০০% প্রতিরোধ করে যদি ৭০% প্রাণী টিকাদান করা হয়। বাংলাদেশে ২০১১ সাল থেকে ম্যাস ডগ ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচি চালু হওয়ায় মৃত্যু ৫০% কমেছে, এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্কমুক্ত দেশের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। এই কর্মসূচি সমাজে সচেতনতা বাড়ায়, যাত্রীদের মধ্যে ভয় কমায় এবং অর্থনৈতিক সাশ্রয় করে—কারণ টিকাদানের খরচ পিইপির চেয়ে অনেক কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ‘ওয়ান হেলথ’ অ্যাপ্রোচের অংশ, যা মানুষ-প্রাণীর স্বাস্থ্যকে একসাথে রক্ষা করে। রাজশাহীর এই উদ্যোগ দেশব্যাপী লক্ষ্য অর্জনে অনুপ্রেরণা যোগাবে।









