পৈতৃক জমি ছিনিয়ে নিতেই ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকি — রাজশাহীর পালপুরে ইন্ধন দিচ্ছে ‘দখলযুদ্ধ’
ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী প্রতিনিধি:
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের পালপুর গ্রামে পৈতৃক জমি নিয়ে দফায় দফায় উত্তেজনা ও সংঘর্ষের নয়া অধ্যায় শুরু হয়েছে। ভুক্তভোগী মো. রাফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, গত ৬-৭ অক্টোবর একই গ্রামের শরিফুল ইসলাম ও তার পরিবারের লোকজন জোরপূর্বক তার বাড়ি দখল করার চেষ্টা করেছে; এ সময় গেট-টয়লেট-প্রাচীর ভাঙচুর করা হয়েছে, গাছ কাটা হয়েছে এবং পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। রাফিকুল বাদী হয়ে গত ৭ অক্টোবর গোদাগাড়ী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
সরাসরি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে দেখা গেছে— ভাঙচুরের ছাই-ছায়া পড়ে আছে বাড়ির সামনের আঙিনা ও দরোজায়; ইট-খোয়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত অভিযুক্তদের হাতে হাম্বল, কোদাল, খুন্তি ও দা পাওয়া গেছে; সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা ফিরে গেছে। স্থানীয়দের ধারণা, জমি-দখল ও দখল-প্রচেষ্টার পেছনে পারিবারিক বিরোধ ও সালিশের সিদ্ধান্ত অমান্য করা মূল কারণ।
মামলার প্রেক্ষাপট ও পারিবারিক বিবরণ
রাফিকুল জানান, তিনি পৈতৃক উৎসে ওই জমিতে বসবাস করেন। অভিযোগ অনুযায়ী ২৫ জানুয়ারি গ্রাম্য সালিশে বিষয়টা মীমাংসা হয়; কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে দুর্বৃত্ত আচরণে ফের হুমকি-মামলা ও দখলের চেষ্টা হয়েছে। জমির অপর অংশীদার মাইনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তিনি শরিফুলকে জমি দখল করতে নির্দেশ দেননি; কোর্টে মামলা চলছে—কোর্ট যদি কাগজপত্র দেখিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত দেয়, তিনি সেটাই মানবেন। অভিযুক্ত শরিফুল দাবি করছেন, জমিটি তার খালুর নামে; বিষয়টি নিয়ম অনুযায়ী আদালতে রয়েছে এবং কাগজপত্র প্রমাণ হলে তিনি সবাইকে দেখাবেন।
গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেছে; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং অভিযোগ তদন্তের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পালপুরের এই ঘটনা আলাদা নয়; দেশের নানা প্রান্তে জমি-দখলকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও ভাঙচুরের সমান উদাহরণ রয়েছে। রাজশাহীরই একটি গ্রামে ২০২৩ সালে জমি বিরোধে সংঘাতে তিনজন নিহত ও অনেকে আহত হওয়ার খবর প্রকাশ পেতেছিল—এরকম ঘটনার ফলে স্থানীয়ভাবে ভয় ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ে।
সামগ্রিকভাবে ‘ল্যান্ড গ্র্যাবিং’ বা জমি দখল কৌশলগত সমস্যা হিসেবে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন থেকে প্রবল আছে—বহু গবেষণায় এতে সামাজিক নির্মাণ, স্থানীয় শক্তির নেটওয়ার্ক এবং আইনি ফাঁক থাকাকে দায়ী করা হয়েছে। গবেষণাগোষ্ঠীর বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, জমি-দখলের পেছনে নানান কৌশল ও স্থানীয় শক্তির জাল সামাজিক নেটওয়ার্ক কাজ করে; প্রতিরোধে কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা জরুরি।
আরো বিস্তৃত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জমি-দখল শুধু ব্যক্তিগত ন্যায্যতার লঙ্ঘন নয়—এটি আদিবাসী ও প্রত্যন্ত সম্প্রদায়গুলোর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও বসবাস-সুরক্ষাকে ধ্বংস করে। বহু ক্ষেত্রে জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনের অনুপযুক্ত প্রতিক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী উচ্ছেদে পতিত হয়।
সমাজে প্রভাব — আর্থিক, মানসিক ও গঠনগত ক্ষতি
জমি-দখল ও তদনুযায়ী ঘটে যাওয়া ভাঙচুরের প্রভাব স্থানীয় জীবনে বহুমাত্রিক। প্রথমত, ভুক্তভোগী পরিবারের তাত্ক্ষণিক আর্থিক ক্ষতি: গৃহস্থালির ক্ষতিপূরণ, ফসল-নষ্ট, বসতঘর মেরামত—সবই যোত-জোরে বহন করা কঠিন। দ্বিতীয়ত, পরিবারগুলোর উপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়; রাতের বেলা বাইরে বের হওয়া বন্ধ, সন্তান-শিক্ষা ব্যাহত এবং স্থানীয় জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়ে। তৃতীয়ত, বিঘ্নিত সালিশ প্রথা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার অভাবে আইনের প্রতি আস্থা কমে যায়—মানুষ আদালতের বদলে নিজেদের-হেফাজতেই দাঁড়াতে পারে, যা সমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলে। একাডেমিক বিশ্লেষণ ও ফিল্ড-স্টাডি এ উদ্বেগগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফারজানা ইয়াসমিন (স্থানীয় আদালত পর্যায়ে কাজ করেন) বলেন, “পরিবারিক জমি বিরোধকে গ্রাম্য সালিশে মীমাংসা করা হয়—কিন্তু সালিশের সিদ্ধান্ত আইনি বাধ্যবাধকতা বহন করে না। যেখানে সালিশ বা ওপরের বদলে পাওয়া রেজল্যুশন মানা হয় না, সেখানে দ্রুত আদালত-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং পুলিশি নিরাপত্তা জরুরি।”









