পুকুরে ডুবে শিশুমৃত্যু কুতুবদিয়া মহামারি রূপ নিয়েছে : নিয়ন্ত্রণযোগ্য সংকটে প্রশাসনের নীরবতা

প্রকাশিত: ১৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:২৪ পিএম
পুকুরে ডুবে শিশুমৃত্যু কুতুবদিয়া মহামারি রূপ নিয়েছে : নিয়ন্ত্রণযোগ্য সংকটে প্রশাসনের নীরবতা

নাজমুল হুদা সাকিব :

উপজেলায় পুকুরের পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী প্রতি মাসে গড়ে ১০ থেকে ১২ জন শিশু এভাবে প্রাণ হারায়। মাত্র গত এক সপ্তাহেই পানিতে ডুবে মারা গেছে আরও চারটি শিশু। এ ধরনের ধারাবাহিক মৃত্যু কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা নয়; বরং এটি একটি সুস্পষ্ট জনস্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তা সংকট।

পুকুর—জীবনের অংশ, কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা ভয়াবহ

গ্রামীণ জীবনে পুকুরের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু অধিকাংশ পুকুরই অরক্ষিত, অনিরাপদ এবং শিশুদের জন্য উচ্চঝুঁকিপূর্ণ।

পুকুরের চারপাশে সুরক্ষাবেষ্টনী নেই,

গভীরতার সতর্কতাসূচক সাইনবোর্ড নেই,

ঘাটগুলো অনিরাপদ ও পিচ্ছিল,

এবং কোনোটিরই নিয়মিত তদারকি নেই।

এই নিরাপত্তাহীনতার সুযোগেই ঘটে যাচ্ছে অপ্রতিরোধ্য মৃত্যু।

সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগ, কিন্তু প্রশাসনের অনীহা

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও তরুণদের দল স্থানীয়ভাবে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। কোথাও অস্থায়ী বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়েছে, কোথাও সতর্কতামূলক ফেস্টুন টানানো হয়েছে, কয়েকটি গ্রামে ‘পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ’ বিষয়ক সভাও হয়েছে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এসব উদ্যোগে উপজেলা প্রশাসনের কোনো দৃশ্যমান সহযোগিতা ছিল না। কোনো সমন্বয়, উৎসাহ বা স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে এসব ছোট উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকা রাখতে পারেনি।

প্রতিরোধ সম্ভব, প্রয়োজন শুধু উদ্যোগ

বিশ্বব্যাপী গবেষণায় প্রমাণিত—পানিতে ডুবে মৃত্যু বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনামূলক মৃত্যুর মধ্যে একটি। সামান্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। যেমন—

১. ঝুঁকিপূর্ণ পুকুরগুলো চিহ্নিত করে বেষ্টনী নির্মাণ

২. প্রতিটি পুকুরে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড

৩. ঘাট ও পানির ধারে নিয়মিত মনিটরিং

৪. স্কুলভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম

৫. স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যৌথ কর্মপরিকল্পনা

৬. শিশুদের জন্য সাঁতার শেখার সুযোগ সৃষ্টি

এগুলো বাস্তবায়ন অত্যন্ত সহজ এবং ব্যয়ও তুলনামূলক কম।

দায় শুধু অভিভাবকদের নয়

প্রশাসনিক দপ্তরগুলো প্রায়ই অভিভাবকদের অসচেতনতা উল্লেখ করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—অভিভাবকরা সবাই সারাদিন রোজগারের জন্য ব্যস্ত জীবনযাপন করেন। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য।

অপর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে কেবল অভিভাবকদের ওপর দায় চাপানো ন্যায়সংগত নয়।

এক সপ্তাহে চার মৃত্যু—এটা কি যথেষ্ট নয়?

প্রতিটি মৃত শিশু একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একটি সমাজের ক্ষতি। এক সপ্তাহে চারটি মৃত্যু প্রশাসনের জন্য সতর্কসংকেত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে কোনো জরুরি উদ্যোগ দেখা যায়নি। এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা প্রশ্ন তোলে—

আর কত মৃত্যু হলে আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নেব?

সময়সীমা এখনই

উপজেলার মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়—শুধু নিরাপদ পুকুর, বাঁচার সুযোগ, এবং শিশুদের জন্য ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ।

এই সংকট মোকাবিলা করা প্রশাসনের জন্য কঠিন কাজ নয়।

কঠিন হলো—উদাসীনতার দেওয়াল ভেঙে সামনে এগোনো।

এই কলামের উদ্দেশ্য অপরাধবোধ সৃষ্টি নয়; বরং স্মরণ করানো যে শিশুর জীবন রক্ষা করা কেবল কর্তব্য নয়, মানবিক দায়িত্বও।

এখনই উদ্যোগ নেওয়া গেলে পরবর্তী সপ্তাহের মৃত্যুসংবাদ হয়তো এড়ানো যাবে।

আর দেরি হলে—আমাদের নীরবতাই আগামী মৃত্যুর সহায়ক হয়ে দাঁড়াবে....