নিষিদ্ধের দাবিতে কোণঠাসা জাতীয় পার্টি: বিতর্কে পুরোনো ‘লাঙল’
স্টাফ রিপোর্টার:
আলোচিত-সমালোচিত রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি (জাপা) আবারও আলোচনার কেন্দ্রে। বন্দুকের নলে ক্ষমতা দখলের পর সামরিক শাসনকে বেসামরিক রূপ দিতে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যে দলটির জন্ম দিয়েছিলেন, সেই দল আজ নতুন করে প্রশ্নের মুখে—তাদের ‘রাজনৈতিক বৈধতা’ নিয়ে।
বিগত কয়েক দশকে নিয়মিত ভাঙন আর নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে দিশেহারা দলটি দেশের সংকটে বড় কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। তবে পটপরিবর্তনের মুহূর্তে প্রভাবকের ভূমিকায় দেখা গেছে একাধিকবার। সর্বশেষ বিতর্কিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে জাপার নাম উচ্চারিত হয়েছে জোরেশোরে—অভিযোগ উঠেছে, জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে সাজানো নির্বাচনে ‘বিশেষ দলকে’ ক্ষমতায় আনতে কাজ করেছে তারা।
এমন প্রেক্ষাপটে, গত বছরের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতিতে দলটি অনেকটাই কোণঠাসা। উঠেছে দাবি—‘জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হোক।’
বিচারের দাবি তুলল এনসিপি:
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র আইনবিষয়ক সম্পাদক জহিরুল ইসলাম মুসা বলেন,
> “আমাদের দাবি হচ্ছে, আইনিভাবে জাতীয় পার্টির যে দায় আছে, তাদের যে অপরাধগুলো আছে, সেগুলোর জন্য তাদের বিচারের মুখোমুখি করা। যারা ফ্যাসিবাদের দোসর ছিল, গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত ছিল, জনগণের সঙ্গে প্রতারণায় জড়িত ছিল—তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে হবে।”
‘ভোটের অংকে ভয় পাচ্ছে কেউ কেউ’ — জাপা মহাসচিব
অন্যদিকে অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী। তিনি বলেন,
> “নতুন কিছু দল—বিশেষ করে গণঅধিকার বা এনসিপি—জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে পারেনি। ফলে তারা ভাবছে, জাতীয় পার্টি ভোটে অংশ নিলে জোটের রাজনীতিতে অনেক হিসাব বদলে যাবে।”
তিনি আরও যোগ করেন,
> “মূলত বিএনপিকে কোণঠাসা করার জন্যই কিছু মহল জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করতে চায় বা ভোটে আসতে দিতে চায় না। আমরা সবসময় নির্বাচনে যেতে আগ্রহী, তবে আগে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ হতে হবে।”
আইনি বাধা নেই নির্বাচনে অংশ নিতে:
সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ও প্রতীক স্থগিত করলেও জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেখছেন না বিশ্লেষকরা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. সাব্বীর আহমেদ বলেন,
> “আপনি আওয়ামী লীগের ব্যাপারে যেমন সিদ্ধান্ত নেবেন, জাতীয় পার্টির ব্যাপারে তেমনি রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে হবে। না হলে নির্বাচন আরও জটিল হবে।”
নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী মনে করেন,
> “আইনগত কোনো ব্যবস্থা ছাড়া শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো দলকে বাদ দেওয়া যাবে না। এতে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠবে।”
অন্য বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন,
> “জাতীয় পার্টির নিবন্ধন বাতিল হয়নি, আবার তাদের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ নয়। তাই তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা নেই।”
ভোটে এখনও ‘লাঙলের’ সমর্থন:
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় পার্টির সমর্থন এখনও মোট ভোটারের ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এ কারণে দলটি নির্বাচনে অংশ নিলে জোটের রাজনীতিতে ‘গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর’ হতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
শেষ কথা:
রাজনীতির অস্থির এই সময়ে জাতীয় পার্টি একদিকে অতীতের দায়ে অভিযুক্ত, অন্যদিকে ভবিষ্যতের রাজনীতিতে সম্ভাব্য ‘কিংমেকার’। দলটি নিষিদ্ধ হবে, না কি আবারও ‘নির্বাচনের খেলায়’ ফিরে আসবে—সেটিই এখন রাজনৈতিক মহলের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।









