কালাইয়ে আলু চাষি ও ব্যবসায়ীদের লোকসান ১৭৭ কোটি টাকা
সউদ আব্দুল্লাহ, কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি:
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার আলু চাষি ও ব্যবসায়ীরা এবারের মৌসুমে ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ভালো দামের আশায় হিমাগারে সংরক্ষণ করা আলু এখন তাদের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বাজারে দাম না বাড়া ও ক্রেতা সংকটের কারণে হিমাগারে জমে থাকা আলু বিক্রি করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন সবাই। উপজেলার ১১টি হিমাগারে সংরক্ষিত প্রায় এক লাখ তিন হাজার ৯০০ টন বা ২০ লাখ ৭৮ হাজার বস্তা আলুতে মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা।
নভেম্বর-ডিসেম্বরে নতুন মৌসুমে আলু রোপণ শুরু হলেও পুরনো আলু এখনও হিমাগারে পড়ে আছে। নিয়ম অনুযায়ী ৩০ অক্টোবরের মধ্যে হিমাগার খালি না করলে সংরক্ষণের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বাজারদরে আলু বিক্রি করলে প্রতিটি বস্তায় অন্তত ৮৫০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এতে অনেকে আলু তুলতে অনাগ্রহী।
আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের সুড়াইল গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুল আলিম আকন্দ ৪ হাজার বস্তা আলু ৬৪ লাখ টাকায় কিনে ভবিষ্যতে ভালো দামে বিক্রির আশায় হিমাগারে রেখেছিলেন। কিন্তু বাজারে দামের পতনে বাধ্য হয়ে বিক্রি করতে হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকায়। এতে প্রায় ৫৯ লাখ টাকার ক্ষতি গুনতে হয়েছে তাকে। দীর্ঘদিনের সঞ্চিত পুঁজি হারিয়ে তিনি এখন দিশেহারা।
পল্লী কোল্ড স্টোরেজে কৃষক ও ব্যবসায়ী মিলে ৪৬০ জন আলু সংরক্ষণ করেছিলেন। শুধু এই হিমাগারেই লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অন্যদিকে আরবি স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজের মালিক প্রদীপ কুমার প্রসাদ জানান, তাদের হিমাগারে দুই লাখ ৬০ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষিত ছিল। তিনবার নোটিশ দেওয়ার পরও ব্যবসায়ীরা আলু তুলছেন না,কারণ তুললেই বড় অঙ্কের ক্ষতি নিশ্চিত। ফলে হিমাগারের কর্মীরাও কাজের অভাবে অলস সময় কাটাচ্ছেন।
আলু ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান বলেন, প্রতিকেজি আলু উৎপাদন থেকে হিমাগারে সংরক্ষণ পর্যন্ত খরচ পড়েছে প্রায় ২৪–২৫ টাকা। কিন্তু পাঁচমাস পর এখন হিমাগারে পাইকারিতে প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০–১১ টাকায়। এতে প্রতিকেজিতে কৃষকদের ১৩–১৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। তিনি জানান, আলু কিনে হিমাগারে মজুত করা ব্যবসায়ীরাও একইভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। উপজেলার বিভিন্ন হিমাগারে এমন ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রায় ১২ হাজার কৃষক ও ব্যবসায়ী। কেউ কেউ ঋণ নিয়ে আলু সংরক্ষণ করেছিলেন, এখন সেই ঋণ শোধ করাও তাদের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
গোলাহার গ্রামের ব্যবসায়ী আবুল হাসনাত বলেন, ছয় হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করেছিলেন, যার মধ্যে পাঁচ হাজার এখনও হিমাগারে পড়ে আছে। প্রতি বস্তায় ১৪০০ টাকা খরচ হলেও বিক্রি করতে গেলে ৯০০ টাকা লোকসান হচ্ছে ফলে প্রায় ৭০ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে কালাইয়ে ১২ হাজার ৫৫ হেক্টর জমিতে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল। এর মধ্যে এক লাখ তিন হাজার ৯০০ টন বা ২০ লাখ ৭৮ হাজার বস্তা আলু ১১টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে ৭ লাখ ৬৬ হাজার ২০৩ বস্তা আলু এখনও হিমাগারে পড়ে আছে। প্রতি বস্তায় গড়ে ৮৫০ টাকা লোকসান ধরলে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুনুর রশিদ বলেন, এ বছর আলুর বাম্পার ফলনের কারণে সরবরাহ বেড়েছে,তাই দামও কমে গেছে। সরকার ২২ টাকা কেজি দরে আলুর ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করলেও তা কার্যকর হয়নি।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানান, সরকারিভাবে আলু কেনার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে সিদ্ধান্ত থাকলেও এখনো কোনো নির্দেশনা না আসায় ক্রয় কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন গত ৫ সেপ্টেম্বর মাসে আক্কেলপুর উপজেলায় সফরে এসে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে সরকার টিসিবির মাধ্যমে আলু কিনবে এবং হিমাগার গেটে কেজিপ্রতি ২২ টাকা দরে আলু কেনা হবে কিন্তু প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও সেই আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় চাষি ও ব্যবসায়ীরা এখন চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।









