মরক্কোর সঙ্গে ড্র করে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু ব্রাজিলের, ভিনিসিয়ুসের গোলে রক্ষা সেলেসাওদের
স্পোর্টস ডেস্ক:
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শুরুতেই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। আফ্রিকার শক্তিশালী দল মরক্কোর দুর্দান্ত আক্রমণের সামনে দীর্ঘ সময় চাপে থাকা সেলেসাওরা শেষ পর্যন্ত ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের অসাধারণ এক গোলে ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে আনে। ফলে ‘সি’ গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ১-১ গোলের ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে দুই দলকে।
রোববার (১৪ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ঐতিহাসিক MetLife Stadium-এ অনুষ্ঠিত ম্যাচে শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করে মরক্কো। বল দখল ও আক্রমণের তীব্রতায় ব্রাজিলকে রীতিমতো চাপে ফেলে দেয় আফ্রিকার প্রতিনিধিরা। যদিও শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল পরাজয় এড়িয়ে অন্তত একটি পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করতে সক্ষম হয়েছে।
ম্যাচের প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে মরক্কো। ষষ্ঠ মিনিটে নিল এল আয়নাউইয়ের শট ডি-বক্সের ভিড়ে আটকে গেলে প্রথম সুযোগ হাতছাড়া হয় তাদের। এরপর একের পর এক আক্রমণে ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রাখে তারা।
প্রথম ১২ মিনিটেই ৭২ শতাংশ সময় বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ছয়টি শট নেয় মরক্কো, যা ম্যাচে তাদের আগ্রাসী মনোভাবেরই প্রমাণ দেয়। ব্রাজিল শুরুতে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পেতে হিমশিম খায়।
১৪তম মিনিটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দারুণ ক্রস থেকে প্রথম উল্লেখযোগ্য আক্রমণ গড়ে ব্রাজিল। তবে ইগর থিয়াগো বলের নাগাল না পাওয়ায় সুযোগ নষ্ট হয়। ১৮তম মিনিটেও আক্রমণ গড়ে তুললেও গোলের দেখা পায়নি সেলেসাওরা।
উল্টো ২১তম মিনিটে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ থেকে এগিয়ে যায় মরক্কো। ব্রাহিম দিয়াজের চমৎকার লম্বা পাস ধরে সামনে এগিয়ে যান ইসমাইল সাইবারি। গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকারকে সামনে পেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় তাঁর মাথার ওপর দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে মরক্কোকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন এই মিডফিল্ডার।
গোল পাওয়ার পরও আক্রমণের ধার কমায়নি মরক্কো। ২৭তম মিনিটে আশরাফ হাকিমির নিচু শট অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। এরপর ৩০তম মিনিটে ব্রাহিম দিয়াজের শট অ্যালিসন সহজেই ধরে ফেলেন। এক মিনিট পর হাকিমির দূরপাল্লার শটও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
ক্রমাগত চাপে থাকা ব্রাজিলকে ৩২তম মিনিটে ম্যাচে ফেরান ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। লুকাস পাকেতার পাস ধরে দুর্দান্ত গতিতে বক্সে প্রবেশ করেন তিনি। এরপর দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে নিখুঁত কোণাকুণি শটে মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনোকে পরাস্ত করে সমতা ফেরান Vinícius Júnior।
এই গোলের পর কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় ব্রাজিল। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে পাকেতার বাইসাইকেল কিক সদৃশ প্রচেষ্টা দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন মরক্কোর গোলরক্ষক বুনো।
দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের নিয়ন্ত্রণ, তবে গোলের দেখা নেই
বিরতির পর কৌশলগত পরিবর্তন আনেন ব্রাজিল কোচ Carlo Ancelotti। হলুদ কার্ড দেখা কাসেমিরো ও রজার ইবানেজকে তুলে নিয়ে মাঠে নামান ফাবিনিও ও দানিলোকে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ব্রাজিল কিছুটা সংগঠিত ফুটবল খেলতে শুরু করে। ৫১তম মিনিটে ভিনিসিয়ুসের ক্রস থেকে ভালো সুযোগ তৈরি হলেও ফিনিশিংয়ের অভাবে তা নষ্ট হয়। পরে ম্যাথিউস কুনহা ও লুইজ এনরিকেকে নামিয়ে আক্রমণে নতুন গতি আনার চেষ্টা করেন আনচেলত্তি।
৬৭তম মিনিটে ব্রুনো গিমারায়েসের পাস থেকে রাফিনিয়া অল্পের জন্য বলের নাগাল পাননি। ৭৮তম মিনিটে ভিনিসিয়ুসের আরেকটি নিখুঁত ক্রস থেকে সুযোগ পেলেও বুনোকে পরাস্ত করতে ব্যর্থ হন রাফিনিয়া।
অন্যদিকে ৭৭তম মিনিটে মরক্কোও একটি সম্ভাবনাময় আক্রমণ গড়ে তুলেছিল, তবে শেষ মুহূর্তে তা ভেস্তে যায়।
ম্যাচের শেষদিকে দুই দলই জয়সূচক গোলের খোঁজে মরিয়া হয়ে ওঠে। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে দানিলো সান্তোসের শট সহজেই ধরে ফেলেন বুনো।
তবে নাটকীয় মুহূর্ত আসে ইনজুরি সময়ের নবম মিনিটে। নিল এল আয়নাউইয়ের শক্তিশালী শট অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন ব্রাজিল গোলরক্ষক Alisson Becker। তাঁর এই সেভই শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলকে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করে।
পরিসংখ্যানে সমান লড়াই, সুযোগে এগিয়ে মরক্কো
ম্যাচে ৫৪ শতাংশ সময় বলের দখল ছিল ব্রাজিলের। তারা মোট ৮টি শট নিয়ে ৫টি লক্ষ্যে রাখতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে মরক্কো ১৩টি শট নেয়, যার ৪টি ছিল গোলমুখে। পরিসংখ্যান বলছে বলের নিয়ন্ত্রণে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও আক্রমণের ধার ও বিপজ্জনক সুযোগ তৈরিতে মরক্কোই ছিল বেশি কার্যকর।
মূল্যবান এক পয়েন্ট নিয়ে সন্তুষ্ট মরক্কো
শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলের সমতায় শেষ হওয়া ম্যাচে ব্রাজিল পূর্ণ তিন পয়েন্ট না পেলেও বিশ্বকাপ অভিযান হার এড়িয়ে শুরু করতে পেরেছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর ধারাবাহিক উন্নতির প্রমাণ রেখে শক্তিশালী ব্রাজিলের বিপক্ষে দাপুটে ফুটবল খেলে মূল্যবান এক পয়েন্ট অর্জন করেছে মরক্কো।
‘সি’ গ্রুপের পরবর্তী ম্যাচগুলোর আগে এই ফলাফল দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকল। বিশেষ করে মরক্কো দেখিয়ে দিল, তারা শুধু অংশ নিতে নয়, বরং বিশ্বকাপের বড় দলগুলোর জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে প্রস্তুত।









