৮ মাসেও গ্রেপ্তার হয়নি মূল আসামিরা, মাহি হত্যার বিচার দাবিতে নাসিরনগরে মানববন্ধন

প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম
৮ মাসেও গ্রেপ্তার হয়নি মূল আসামিরা, মাহি হত্যার বিচার দাবিতে নাসিরনগরে মানববন্ধন

ছবি: বিডি মেইল

খ ম জায়েদ হোসেন, নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি


ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূ সাদিয়া আক্তার মাহিকে (২২) হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলার আট মাস পেরিয়ে গেলেও বিচার না পাওয়ার অভিযোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী। এ সময় মামলার মূল আসামিসহ অন্যদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।


বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুর ১২টায় নাসিরনগর উপজেলা সদরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে নিহতের পরিবারের সদস্য, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষার্থী, নারী নেত্রীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।


পরিবার ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে নাসিরনগর উপজেলার চাপরতলা ইউনিয়নের খান্দুরা গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে আলী আহমদের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার পিয়াইম গ্রামের দিয়ারিশ মিয়ার মেয়ে সাদিয়া আক্তার মাহির।


নিহতের পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই মোটা অঙ্কের যৌতুকের দাবিতে স্বামী আলী আহমদ ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন মাহির ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। যৌতুক দিতে অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।


এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে খান্দুরা গ্রামে শ্বশুরবাড়ি থেকে মাহির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিবারের দাবি, তাঁকে শ্বাসরোধ করে ও মুখে বিষ ঢেলে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।


এ ঘটনায় মাহির বাবা দিয়ারিশ মিয়া বাদী হয়ে গত ১ মার্চ নাসিরনগর থানায় স্বামী আলী আহমদসহ ১২ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। তবে মামলা দায়েরের আট মাস পেরিয়ে গেলেও পুলিশ মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের। তাঁদের দাবি, মূল আসামি স্বামীসহ অন্যরা এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।


এদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নাসিরনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুমন দাস তদন্ত শেষে আদালতে যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন, তাতে মাহিকে হত্যা করা হয়নি, বরং অসুস্থতাজনিত কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনকে পক্ষপাতদুষ্ট ও মনগড়া দাবি করে প্রত্যাখ্যান করেছে নিহতের পরিবার।


মানববন্ধনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাহির বাবা দিয়ারিশ মিয়া বলেন, ‘আমার সরল-সোজা মেয়েটাকে বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য অত্যাচার করত তারা। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সবাই মিলে আমার মেয়েটাকে মেরে ফেলেছে। আট মাস ধরে থানায় ঘুরছি, কিন্তু আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না।’


তিনি আরও অভিযোগ করেন, আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সুমন দাস তাঁকে বলেছেন, ‘সব মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করা যায় না।’ এমনকি আসামির টাকায় তাঁর সংসার চলে বলেও মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।


তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সুমন দাস বলেন, ‘আসামির টাকায় সংসার চলে—এমন কোনো মন্তব্য আমি করিনি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে যা এসেছে, আমি তার ভিত্তিতেই প্রতিবেদন দিয়েছি। প্রতিবেদনে ভুল কিছু লেখা হয়নি।’


নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করেই প্রতিবেদন দিয়েছি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে হত্যার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। আসামির টাকায় পুলিশের সংসার চলে—এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভিত্তিহীন।’


মানববন্ধন থেকে অংশগ্রহণকারীরা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পুনঃতদন্ত, মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)তে হস্তান্তর এবং মূল আসামিসহ সংশ্লিষ্টদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান। একই সঙ্গে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মাহি হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তাঁরা।