সুন্দরবনে ২১ জেলে নিখোঁজ, দস্যু আতঙ্কে প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা

প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৭ পিএম
সুন্দরবনে ২১ জেলে নিখোঁজ, দস্যু আতঙ্কে প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা

সূত্রঃ সংগৃহীত

প্রিন্স মন্ডল অলিফ, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি


সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে একসঙ্গে ২১ জেলে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগের পাশাপাশি বনাঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের নারকেলবাড়িয়া, আমড়ারিয়া, ভদ্রা ও ভাঙ্গা এলাকার আশপাশে কয়েকটি মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারে সশস্ত্র হামলার পর জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও নিখোঁজ জেলেদের কোনো সন্ধান মেলেনি।


নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে সুন্দরবনের নদী ও খালে অভিযান চালাচ্ছে কোস্ট গার্ড। দুর্গম বনাঞ্চলে সম্ভাব্য অপহরণকারীদের অবস্থান শনাক্তে ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে তল্লাশি চালিয়েও ২১ জেলের অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারায় স্বজনদের উৎকণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছে।


একাধিক নৌযানে হামলার অভিযোগ


বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরার সময় কয়েকটি নৌকা ও ট্রলারে সশস্ত্র ব্যক্তিরা হামলা চালায়। হামলাকারীরা জেলেদের জিম্মি করে মাছ ধরার সরঞ্জাম, মুঠোফোন ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি মাছ ধরার ট্রলারও নিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।


স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো হামলা নাকি পরিকল্পিতভাবে একাধিক নৌযানে পরিচালিত অভিযান—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।


কারা জড়িত, নিশ্চিত নয়


স্থানীয় কয়েকটি সূত্র এসব ঘটনার সঙ্গে মজনু, করিম শরীফ ও বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বাহিনীকে এসব ঘটনার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করেনি।


ফলে নিখোঁজ জেলেদের অপহরণের পেছনে কারা রয়েছে, তাঁদের কোথায় রাখা হয়েছে এবং তাঁদের উদ্ধারে কী ধরনের গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।


মহাজনদের গোপন যোগাযোগের দাবি


নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে স্থানীয় কয়েকজন মহাজন নিজেদের মতো করে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মহাজন জানান, সম্ভাব্য অপহরণকারীদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ ও দর-কষাকষির চেষ্টা চলছে।


তবে মুক্তিপণ হিসেবে কত টাকা দাবি করা হয়েছে বা আদৌ কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ক দাবি করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে তাঁরা প্রকাশ্যে কিছু বলতে রাজি হননি।


মহাজনদের এ ধরনের যোগাযোগের বিষয়টি সত্য হলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হচ্ছে, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


স্বজনদের দিন কাটছে উৎকণ্ঠায়


নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের সদস্যরা পাঁচ দিন ধরে প্রিয়জনের কোনো খবর না পেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।


স্বজনেরা জানান, তাঁরা কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বা প্রতিশ্রুতি চান না; দ্রুত অভিযান চালিয়ে নিখোঁজ জেলেদের জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই তাঁদের একমাত্র দাবি।


অন্য জেলেদের মধ্যেও আতঙ্ক


২১ জেলের নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া অন্য জেলেদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধার করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও জেলে সশস্ত্র হামলার শিকার হতে পারেন।


জেলেদের দাবি, সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ, খাল ও মাছ ধরার এলাকাগুলোতে নিয়মিত নৌ টহল বাড়ানো দরকার। বিশেষ করে রাতে বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করা জেলেদের নিরাপত্তায় বন বিভাগ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বিত নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।


বন বিভাগের পরামর্শ


পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, নিখোঁজ জেলেদের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাঁদের উদ্ধারে কোস্ট গার্ডের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।


তিনি বলেন, সুন্দরবনে অবস্থানরত জেলেদের রাতে দলবদ্ধভাবে থাকতে এবং সম্ভব হলে বন বিভাগের অফিস ও টহল ফাঁড়ির আশপাশে অবস্থান করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


ড্রোনে নজরদারি, তবু অজানা ২১ জেলের অবস্থান


কোস্ট গার্ড সদস্যরা সম্ভাব্য এলাকাগুলোতে নৌপথে তল্লাশির পাশাপাশি ড্রোনের মাধ্যমে দুর্গম বনাঞ্চলে নজরদারি চালাচ্ছেন। তবে বুধবার পর্যন্ত নিখোঁজ ২১ জেলের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।


একসঙ্গে ২১ জেলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তাঁদের পরিবারগুলোর পাশাপাশি সুন্দরবনের ওপর জীবিকার জন্য নির্ভরশীল হাজারো জেলের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নিখোঁজ জেলেরা কোথায় এবং তাঁদের উদ্ধারে চলমান অভিযান কত দ্রুত সফল হবে।


স্বজনদের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। তাঁদের প্রত্যাশা, সুন্দরবনের দুর্গম এলাকায় চলমান তল্লাশি দ্রুত সফল হবে এবং নিখোঁজ ২১ জেলেকে জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।


এমকে/বিএম২৪