বঙ্গোপসাগরের গভীর নিম্নচাপ স্থলভাগে, চার বন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত
সূত্রঃ সংগৃহীত
প্রিন্স মন্ডল অলিফ, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপটি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমানে ভারতের উত্তর উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশ ও সংলগ্ন দক্ষিণ ওডিশার স্থলভাগে অবস্থান করছে। ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টা ভারতীয় সময় পর্যন্ত গভীর নিম্নচাপটির কেন্দ্র ছিল প্রায় ১৮.৫ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ ও ৮৩.৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এটি অন্ধ্রপ্রদেশের কলিঙ্গপটনমের প্রায় ৭০ কিলোমিটার পশ্চিম-উত্তরপশ্চিমে, ওডিশার রায়গড়ার ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্বে এবং কোরাপুটের প্রায় ৯০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণপূর্বে অবস্থান করছিল। সিস্টেমটি উত্তর-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের ওপর সরাসরি আঘাতের আশঙ্কা কমলেও এর প্রভাবে দেশের সমুদ্রবন্দর, উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উপকূলীয় জেলায় বেশি প্রভাব
গভীর নিম্নচাপটি বর্তমানে ভারতের স্থলভাগে অবস্থান করায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, বরগুনা, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলায় মেঘলা আকাশ, দমকা হাওয়া এবং বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্যসেবা (BAMIS)-এর BMD-ভিত্তিক পরবর্তী সাত দিনের জেলা মডেল পূর্বাভাসে ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত বাগেরহাটে মোট প্রায় ৭২ মিলিমিটার, খুলনায় ৬২ মিলিমিটার, ভোলায় ৫৮ মিলিমিটার, পিরোজপুরে ৪৪ মিলিমিটার, পটুয়াখালীতে ৩৮ মিলিমিটার, বরিশালে ৩৭ মিলিমিটার এবং ঝালকাঠিতে ৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের সম্ভাব্য পরিমাণ দেখানো হয়েছে। এগুলো মডেলভিত্তিক মোট পূর্বাভাস—কোনো নির্দিষ্ট দিনে ওই পরিমাণ বৃষ্টি হবেই এমন নয়।
বাগেরহাটে বিশেষ করে মোংলা, পশুর নদী ও সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির প্রভাব বেশি অনুভূত হতে পারে। জেলা-ভিত্তিক মডেল পূর্বাভাসে ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী কয়েক দিনে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে এবং মোট বৃষ্টির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি দেখানো হয়েছে। ফলে নিম্নাঞ্চল, নদী ও খালের তীর এবং সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানকারীদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলেও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। BAMIS-এর মডেল পূর্বাভাসে খুলনায় ৭২ ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে; সাতক্ষীরায়ও ২৩ মিলিমিটারের মতো মোট বৃষ্টির মডেল পূর্বাভাস রয়েছে। উপকূলীয় হওয়ায় দমকা হাওয়া এবং নদী-খালসংলগ্ন এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বরিশাল বিভাগের বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতেও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। মডেল পূর্বাভাসে ভোলা, পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে তুলনামূলক বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পটুয়াখালী ও ভোলার উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী এলাকায় বাতাসের গতি বেড়ে গেলে নৌযান চলাচলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হতে পারে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজারেও নজরদারি প্রয়োজন
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরও ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেতের আওতায় রয়েছে। BAMIS-এর মডেল পূর্বাভাসে চট্টগ্রামে ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী সময়ের জন্য প্রায় ৩২ মিলিমিটার এবং কক্সবাজারে প্রায় ১৯ মিলিমিটার মোট বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। তবে সমুদ্রের অবস্থা এবং বাতাসের পরিস্থিতির কারণে উপকূল ও গভীর সাগরে ঝুঁকি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
দেশের মধ্যাঞ্চলে কী হতে পারে
যশোর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, রাজবাড়ী, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর ও আশপাশের জেলাগুলোতে গভীর নিম্নচাপের সরাসরি প্রভাব উপকূলের তুলনায় কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও মেঘলা আকাশ, বিচ্ছিন্ন বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। BAMIS-এর মডেল পূর্বাভাসে যশোরে প্রায় ১১ মিলিমিটার, গোপালগঞ্জে ৭ মিলিমিটার, মাদারীপুরে ২ মিলিমিটার, রাজবাড়ীতে ২ মিলিমিটার এবং ঢাকায় প্রায় ১ মিলিমিটার মোট বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে।
উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল
রংপুর বিভাগের কয়েকটি জেলায়ও বৃষ্টির প্রবণতা থাকতে পারে। মডেল পূর্বাভাসে রংপুর ও কুড়িগ্রামে প্রায় ৪৮ ও ৫৭ মিলিমিটার, গাইবান্ধায় ৪১ মিলিমিটার এবং দিনাজপুরে ৫৪ মিলিমিটার পর্যন্ত মোট বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। তবে এসব সংখ্যা পুরো পূর্বাভাস সময়ের মডেলভিত্তিক মোট এবং নিম্নচাপের সরাসরি প্রভাব হিসেবে প্রতিটি জেলায় একই সময়ে ভারী বৃষ্টি হবে—এমন অর্থ করে না।
রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, জয়পুরহাট, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায়ও বৃষ্টি হতে পারে। BAMIS-এর মডেল পূর্বাভাসে জয়পুরহাটে প্রায় ৩৩ মিলিমিটার, পাবনায় ৩০ মিলিমিটার, রাজশাহীতে ২৬ মিলিমিটার, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৭ মিলিমিটার এবং বগুড়ায় ১৪ মিলিমিটার পর্যন্ত মোট বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চল
সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও আশপাশের এলাকাতেও বিচ্ছিন্ন বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। BAMIS-এর মডেলে মৌলভীবাজারে প্রায় ১৭ মিলিমিটার এবং ময়মনসিংহে প্রায় ১১ মিলিমিটার বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। নেত্রকোনায়ও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের তুলনায় ভারী বৃষ্টির ঝুঁকি ভারতে
এদিকে ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ সতর্কতায় দেখা যাচ্ছে, গভীর নিম্নচাপটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ছে ওডিশা ও উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশে। ওডিশার জন্য ২৪ সেপ্টেম্বর অতি ভারী বৃষ্টি, ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর খুব ভারী বৃষ্টি এবং ২৭ সেপ্টেম্বর ভারী বৃষ্টির সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বজ্রপাত ও দমকা হাওয়ার ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে।
ওডিশার খোর্ধা জেলায় ২৪ সেপ্টেম্বর গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৪ মিলিমিটার এবং বালেশ্বরে ৫৬ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ওই দুই জেলার জন্যও ভারী বৃষ্টি, বজ্রপাত ও ঘণ্টায় ৪০-৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত দমকা হাওয়ার সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গেও এর প্রভাব রয়েছে। ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের ২৪ সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাস অনুযায়ী গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে ২৪ সেপ্টেম্বর খুব ভারী এবং ২৫ সেপ্টেম্বর ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম অঞ্চলেও ২৪ সেপ্টেম্বর খুব ভারী এবং ২৫ সেপ্টেম্বর খুব ভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে।
সিস্টেমটির বর্তমান অবস্থান ও গতিপথ
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে গভীর নিম্নচাপটি গত ছয় ঘণ্টায় প্রায় ৭ কিলোমিটার/ঘণ্টা বেগে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে এটি উত্তর উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশ ও দক্ষিণ ওডিশার ওপর অবস্থান করছিল। পূর্বাভাস অনুযায়ী এটি আরও উত্তর-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ধীরে ধীরে দুর্বল হবে এবং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থাৎ, বর্তমান গতিপথ অনুযায়ী সিস্টেমটি বাংলাদেশের দিকে সরাসরি অগ্রসর না হয়ে ভারতের স্থলভাগের ওপর দিয়ে আরও উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রধান উদ্বেগ এখন সিস্টেমটির সরাসরি আঘাত নয়; বরং এর পার্শ্বপ্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগরে ঝোড়ো আবহাওয়া, সমুদ্র উত্তাল থাকা এবং দেশের উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি।
নদী ও নিম্নাঞ্চলের বিষয়ে সতর্কতা
বৃষ্টিপাতের সঙ্গে নদী, খাল ও নিম্নাঞ্চলে পানি জমার সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষ করে বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলার নিচু এলাকা এবং নদী-খালসংলগ্ন জনপদে টানা বৃষ্টি হলে স্থানীয়ভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাস বা ব্যাপক নদী প্লাবনের কোনো পৃথক সরকারি সতর্কতা পাওয়া যায়নি; তাই এ বিষয়ে অতিরঞ্জিত তথ্য না ছড়িয়ে স্থানীয় পরিস্থিতি ও পরবর্তী BMD বুলেটিন অনুসরণ করা জরুরি।
নৌযান ও জেলেদের জন্য সতর্কতা
চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত থাকায় সমুদ্রগামী মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত নৌযানগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উপকূলীয় জেলা ও নদীবন্দরগুলোর ক্ষেত্রেও হঠাৎ দমকা হাওয়া ও বৃষ্টির সময় ছোট নৌযান চলাচলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সার্বিক পরিস্থিতি
সব মিলিয়ে ২৪ সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতিতে বাগেরহাট-খুলনা-পিরোজপুর-পটুয়াখালী-বরিশাল-ভোলা-বরগুনা-ঝালকাঠি এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলীয় অঞ্চলে আবহাওয়ার পরিবর্তন ও বৃষ্টির সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি নজরে রাখতে হবে। দেশের মধ্যাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলেও বিচ্ছিন্ন বৃষ্টি হতে পারে। তবে ভারতের ওডিশা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বাংলাদেশের ওপর গভীর নিম্নচাপটির প্রত্যক্ষ প্রভাব বর্তমানে সীমিত হওয়ার দিকেই রয়েছে।
আবহাওয়া পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় পরবর্তী সামুদ্রিক সতর্কবার্তা, ভারী বৃষ্টির সতর্কতা ও স্থানীয় পূর্বাভাস প্রকাশিত হলে পরিস্থিতির আরও নির্ভুল চিত্র পাওয়া যাবে। বিশেষ করে উপকূলীয় জেলা, মোংলা ও পায়রা বন্দর, সুন্দরবন এবং বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত জেলেদের জন্য পরবর্তী BMD নির্দেশনা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
এমকে/বিএম২৪









