পঞ্চগড়ে সার-বীজ ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, মনিটরিং কমিটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৬ পিএম
পঞ্চগড়ে সার-বীজ ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, মনিটরিং কমিটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

ছবি: সংগৃহীত

সাইয়্যেদ মুহাম্মদ শান্ত, পঞ্চগড় প্রতিনিধি


পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নে সরকারি সার ও বীজ ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। ১৬ জন আবেদনকারীর তথ্য যাচাই-বাছাই ও তদন্ত প্রতিবেদনে অসংগতি থাকার পরও তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম কৃষি মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ হিসেবে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন আবেদনকারী। একই সঙ্গে নীতিমালার সব শর্ত পূরণ করেও যোগ্য আবেদনকারীর নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি উঠেছে।


এ ঘটনায় জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন সার ও বীজ ডিলার নিয়োগ ও মনিটরিং কমিটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের কেউ কেউ। তাঁরা পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।


তিন প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগ


অভিযোগকারী ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, মেসার্স লিয়ন এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স শাহজাহান খান ও মেসার্স আসিক ট্রেডার্সের আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি অসংগতি রয়েছে।


মেসার্স লিয়ন এন্টারপ্রাইজ: অভিযোগ রয়েছে, একই পরিবারের একাধিক সদস্য ভিন্ন নামে ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছেন। তিনটি আবেদনের বিপরীতে একটি গোডাউন দেখানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। সরকারি নীতিমালায় একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির আবেদনসংক্রান্ত বিধিনিষেধ লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।


মেসার্স শাহজাহান খান: অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট আবেদনকারী অমরখানা ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা ও ভোটার নন; তিনি পঞ্চগড় পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ভোটার হওয়ার শর্ত প্রযোজ্য হলে তাঁর যোগ্যতা পুনরায় যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।


মেসার্স আসিক ট্রেডার্স: প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব গোডাউন এবং জমির মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, পৈতৃক জমিতে অবকাঠামো দেখানো হলেও বৈধ মালিকানা বা জমির বণ্টনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি দাখিল করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।


তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।


যোগ্য হয়েও তালিকায় নাম নেই, দাবি আবেদনকারীর


মেসার্স তিন বোন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ছোলায়মান আলী দাবি করেন, ডিলার নিয়োগের নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করেই তিনি আবেদন করেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গোডাউন, জমির কাগজপত্র, ব্যাংক সচ্ছলতা এবং স্থানীয় ভোটার হওয়ার প্রমাণপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সুপারিশ তালিকায় তাঁর নাম রাখা হয়নি।


ছোলায়মান আলী ও স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন ও আবেদন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অসংগতি রয়েছে। কেন তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কারণ এবং পয়েন্টভিত্তিক মূল্যায়ন প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।


মনিটরিং কমিটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন


জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন ডিলার নিয়োগ ও মনিটরিং কমিটি অভিযোগগুলোর বিষয়ে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহলের কেউ কেউ। তাঁদের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদনের মন্তব্য ও আবেদনকারীদের দাখিল করা নথিপত্র পুনরায় যাচাই করে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।


তাঁদের মতে, সরকারি সার ও বীজ বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি না হলে কৃষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।


পাঁচ দফা দাবি


ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হলো—


১. অমরখানা ইউনিয়নের ১৬ জন আবেদনকারীর তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রাথমিক মূল্যায়ন নতুন করে যাচাই করতে হবে।


২. মেসার্স লিয়ন এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স শাহজাহান খান ও মেসার্স আসিক ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে ওঠা ভোটার পরিচয়, গোডাউন, জমির মালিকানা ও একই পরিবারের একাধিক আবেদনের অভিযোগ পুনরায় পরীক্ষা করতে হবে।


৩. মেসার্স তিন বোন ট্রেডার্সের দাখিল করা নথিপত্র পুনর্মূল্যায়ন করে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কারণ জানাতে হবে।


৪. তদন্তে অনিয়ম বা তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তি বা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।


৫. সব আবেদনকারীর ক্ষেত্রে একই সরকারি নীতিমালা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রয়োগ করে স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে হবে।


সার ও বীজ ডিলার নিয়োগের সঙ্গে কৃষকদের কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি ও স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি সরাসরি জড়িত। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য গ্রহণ এবং নীতিমালা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।


এমকে/বিএম২৪