ত্রিশালে ইসলামী ফাউন্ডেশনের সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের অর্থ দাবির অভিযোগ
সংগৃহীত
রাকিবুল ইসলাম, ত্রিশাল প্রতিনিধি
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা ইসলামী ফাউন্ডেশনের সুপারভাইজার জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে কেন্দ্র পরিদর্শনের নামে শিক্ষকদের কাছে অর্থ দাবি, চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি এবং ব্যাংক হিসাব লক করে টাকা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সুপারভাইজার।
অভিযোগকারী শিক্ষকদের দাবি, কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন অজুহাতে তাঁদের কাছে টাকা চাওয়া হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কেন্দ্র খালি করে দেওয়া কিংবা চাকরি হারানোর হুমকি দেওয়া হয়। কয়েকজন শিক্ষক আরও অভিযোগ করেছেন, তাঁদের ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত জটিলতার পর অর্থ দাবি করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী ফাউন্ডেশনের এক শিক্ষক বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে আসছি। কিন্তু কেন্দ্র পরিদর্শনের নামে টাকা দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। মডেল কেয়ারটেকার আরিফের মাধ্যমে টাকা চাওয়ার রেকর্ডও আমাদের কাছে আছে। আমরা চাই, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
হাফেজ মোহাম্মদ কামাল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে তিনি তাঁর কেন্দ্র পরিচালনা করছেন। তবে সুপারভাইজার জাহাঙ্গীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শিক্ষকদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ দাবি করা হচ্ছে। তাঁর কাছেও টাকা চাওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
কামাল হোসেন বলেন, শিক্ষক হিসেবে তাঁরা যে সামান্য সম্মানী পান, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। এর মধ্যে সেই অর্থের একটি অংশ অন্যকে দিতে হলে স্বাভাবিক জীবনযাপন ও দায়িত্ব পালন দুরূহ হয়ে পড়ে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, শিক্ষকদের হয়রানি বন্ধ এবং অনৈতিকভাবে অর্থ দাবির অভিযোগের যথাযথ প্রতিকার দাবি করেন।
ত্রিশাল উপজেলার সানকিভাঙ্গা কেন্দ্রের শিক্ষক আব্দুল জব্বারও সুপারভাইজার জাহাঙ্গীর ও মডেল কেয়ারটেকার আরিফের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অর্থ দাবির অভিযোগ তুলেছেন।
আব্দুল জব্বারের ভাষ্য অনুযায়ী, একদিন সকাল ৮টা ৫১ মিনিটে জাহাঙ্গীর ও আরিফ তাঁর কেন্দ্রে গিয়ে ছুটি দেওয়ার কারণ জানতে চান। তিনি জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাস সকাল ৯টায় শুরু হওয়ায় সাড়ে ৮টার দিকে ছুটি দিয়েছিলেন। পরে তাঁকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে অফিসে যেতে বলা হয়। সেখানে সার্টিফিকেট দেখানোর পর তাঁকে চাকরি থাকবে না বলে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে পরে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন বলেও দাবি তাঁর।
আব্দুল জব্বার আরও অভিযোগ করেন, কয়েক দিন পর তাঁর বেতন ব্যাংকে জমা হওয়ার বার্তা এলেও ব্যাংকে গিয়ে তিনি টাকা তুলতে পারেননি। পরে অফিসে যোগাযোগ করলে তাঁর কাছে ১৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। দর-কষাকষির একপর্যায়ে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়ে কথা হয় বলে জানান তিনি। পরে বেতন তুলে বাড়ি ফেরার পথে মডেল কেয়ারটেকার আরিফ তাঁকে বারবার ফোন করেন বলেও অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, পরে পাঁচ হাজার টাকা দিতে পারবেন বলে জানান। তাঁর দাবি, ইসলামী ফাউন্ডেশনের আরও কয়েকজন শিক্ষক, বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের কাছ থেকেও একইভাবে অর্থ চাওয়া হচ্ছে। অন্য শিক্ষকদের কাছ থেকে যে পরিমাণ টাকা নেওয়া হচ্ছে, তাঁর কাছ থেকেও তার চেয়ে কম নেওয়া যাবে না বলে তাঁকে জানানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ত্রিশাল উপজেলার আমিরাবাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং গুজিয়াম কাচাচড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ইসলামী ফাউন্ডেশনের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত শাহজাহানও সুপারভাইজার জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ করেছেন।
শাহজাহানের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেও গত কয়েক মাস ধরে তাঁর কাছে অনৈতিকভাবে টাকা চাওয়া হচ্ছিল। গত ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ব্যাংক থেকে বকেয়াসহ তিন মাসের মোট ১৮ হাজার ৮০০ টাকা উত্তোলনের পর চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ওই অর্থের মধ্যে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অন্য এক শিক্ষক বলেন, ব্যাংক হিসাব লক করে অর্থ দাবির অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত জটিলতার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে কেউ অন্যায়ভাবে হয়রানির শিকার হয়ে থাকলে তাঁর প্রতিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
এদিকে ত্রিশালের কয়েকজন আলেম বলেন, ইসলামী ফাউন্ডেশনের শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ দাবি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
অভিযোগ অস্বীকার সুপারভাইজারের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী ফাউন্ডেশনের ত্রিশাল উপজেলা শাখার সুপারভাইজার জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। তিনি কোনো শিক্ষকের কাছে অনৈতিকভাবে টাকা দাবি করেননি এবং কাউকে ভয়ভীতি দেখানো বা হয়রানিও করেননি বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
তদন্তের আশ্বাস ইউএনওর
এ বিষয়ে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসনাত জাহান খান বলেন, তিনি অভিযোগ পেয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমকে/বিএম২৪








