চট্টগ্রামে ৩০০ বছরের পুরোনো পূজামণ্ডপে প্রথমবার একসঙ্গে ডিসি-এসপি
ছবি : বিডি মেইল
মো. কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
লোহাগাড়ায় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শন, শীর্ষ দুই কর্মকর্তার উপস্থিতিতে আশ্বস্ত আয়োজকেরা
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো পদুয়া গুপ্তবাড়ি সর্বজনীন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। আয়োজকদের দাবি, ঐতিহ্যবাহী এই মণ্ডপে এবারই প্রথম জেলার প্রশাসন ও পুলিশের শীর্ষ দুই কর্মকর্তা একসঙ্গে পরিদর্শনে এসেছেন। তাঁদের উপস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন পূজা উদ্যাপন কমিটির নেতারা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখতে মণ্ডপটিতে যান জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার। এ সময় তাঁরা আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সার্বিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে খোঁজখবর নেন।
লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত মণ্ডপটি পদুয়া বাজার থেকে প্রায় ৪০০ মিটার পূর্বে। স্থানীয় আয়োজকদের দাবি, প্রায় তিন শতাব্দী ধরে এখানে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এর আগে বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা মণ্ডপটি পরিদর্শন করলেও জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের একসঙ্গে আসার ঘটনা তাঁদের জানা নেই।
পদুয়া গুপ্তবাড়ি সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির সভাপতি অতনু গুপ্ত ও সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ গুপ্ত জানান, জেলার শীর্ষ দুই কর্মকর্তার একসঙ্গে মণ্ডপ পরিদর্শনে তাঁরা আনন্দিত ও আশ্বস্ত। এতে প্রশাসনের প্রতি তাঁদের আস্থা আরও বেড়েছে। পূজাকে ঘিরে তাঁরা কোনো নিরাপত্তাশঙ্কাও অনুভব করছেন না।
আয়োজকদের একজন বলেন, ‘তাঁদের মতো ব্যক্তিরা আমাদের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে এসেছেন, এটা অবশ্যই ভালো লাগার বিষয়। এতে নিশ্চিন্ত বোধ করছি।’
সম্প্রীতি রক্ষায় সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে
এর আগে লোহাগাড়া উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসব দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বন্ধনের পেছনে রয়েছে বহু প্রজন্মের ত্যাগ।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের শক্তি, আমাদের অহংকার। আমরা নিশ্চয়ই চাই না, বিশ্বের কাছে আমাদের এই গৌরবময় ঐতিহ্য কোনোভাবে খাটো হয়ে যাক।’
উৎসবের আনন্দ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পূজা উদ্যাপন কমিটি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক বলেন, এ বছর পূজামণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে। দর্শনার্থীর উপস্থিতিও বাড়তে পারে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার মণ্ডপগুলোর জন্য সহায়তা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের দায়িত্বও বেড়েছে।
প্রতিমা মণ্ডপে আনা থেকে শুরু করে বিজয়া দশমীর বিসর্জন পর্যন্ত সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছাসেবকদের পালাক্রমে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন তিনি। কোনো সময় যেন মণ্ডপ নজরদারির বাইরে না থাকে, সে বিষয়েও সতর্ক করেন।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অপচেষ্টা সম্পর্কে সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, উৎসবের আনন্দ যাতে কোনোভাবেই বিষাদে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
৭০ পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা, গুজব ঠেকাতে সাইবার নজরদারি
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, লোহাগাড়ায় ৭০টি সর্বজনীন পূজামণ্ডপ রয়েছে। এসব মণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের প্রস্তুতি প্রায় শেষ।
গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে স্থায়ী পুলিশি দায়িত্বের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ টহল, সাদাপোশাকে নজরদারি ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা থাকবে বলে জানান তিনি।
পুলিশ সুপার বলেন, দুর্গাপূজাকে ঘিরে অন্যতম উদ্বেগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার। এসব প্রতিরোধে জেলা পুলিশের সাইবার ইউনিটের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সাইবার ইউনিটও কাজ করবে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং পূজা উদ্যাপন পরিষদের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত সঠিক তথ্য প্রচারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পূজা চলাকালে মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধ ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ঠেকাতেও বাড়তি নজরদারি থাকবে। লোহাগাড়ার পাহাড়ি এলাকায় সক্রিয় অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে শিগগিরই বড় অভিযান চালানো হবে বলেও জানান পুলিশ সুপার।
মণ্ডপে মণ্ডপে গিয়ে প্রস্তুতি দেখছেন ডিসি
পদুয়া গুপ্তবাড়ি পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, দুর্গাপূজার প্রস্তুতি সরেজমিনে দেখতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর কর্মকর্তাদের নিয়ে বিভিন্ন মণ্ডপ পরিদর্শন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা মণ্ডপে মণ্ডপে যাচ্ছি। তাদের সার্বিক প্রস্তুতি কেমন, কোনো সমস্যা আছে কি না, তাদের পরিকল্পনা কী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোতায়েন কেমন হবে—এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করছি।’
গুপ্তবাড়ি পূজামণ্ডপের প্রস্তুতির প্রশংসা করে জেলা প্রশাসক বলেন, মণ্ডপের কাজ প্রায় শেষ। আয়োজকদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখে তাঁর ভালো লাগছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, তাঁদের এই সার্বিক আয়োজন সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে এবং আমাদের যে ঐতিহ্য, আমাদের যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রয়েছে, সেটি অটুট থাকবে।’
এ সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
মতবিনিময় সভা ও অন্যান্য মণ্ডপ পরিদর্শন
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত, জেলা আনসার ও ভিডিপি কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন এবং লোহাগাড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মং এছেন।
এ ছাড়া বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে জেলা প্রশাসক উপজেলার দুটি এতিমখানার শিশুদের মধ্যে ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণ করেন।
পরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার পদুয়া গুপ্তবাড়ি ছাড়াও পদুয়া হিন্দু বড়পাড়া বাসুদেববাড়ি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁরা আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।









