অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ জোগাতে পদ্মায় ইলিশ ধরতে গিয়ে আটক জেলে
ছবি : বিডি মেইল
রবিউল মোল্লা, শরীয়তপুর জেলা প্রতিনিধি
“বাবা, তোমার পা দুইটা ধরি, আমার ছেলেকে বাঁচাও। আমার ছেলের বউ আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বউয়ের ওষুধপথ্য আর ফলমূলের খরচ জোগানোর জন্য আমার পোলা আজ সকালে বন্ধুকে নিয়ে জালসহ নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছিল। যখন আমার পোলা মাছ ধরতে নামবে, তখন পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে গেছে।”
পদ্মা নদীতে ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরতে গিয়ে মাঝিরঘাট নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যদের হাতে আটক শুক্কুর মোল্লার মা ইয়াসা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন। সোমবার বিকেল ৪টার দিকে মাঝিরঘাট নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সামনে প্রতিবেদকের কাছে তিনি এভাবেই ছেলের আটকের ঘটনা তুলে ধরেন।
ইয়াসা বেগম বলেন, “আমার ছেলের চার বছরের একটি মেয়ে ও এক বছরের একটি ছেলে আছে। এখন ওদের খাওয়াবে কে? আর বউয়ের ওষুধপথ্য কিনবে কে? আমার ছেলে যা আয় করত, তা দিয়েই আমরা সংসার চালাতাম। এখন আমরা দোজখের মধ্যে পড়ে গেছি।”
সরকারি সহায়তা পেয়েছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা কোনো সরকারি সহায়তা পাইনি। আগে তিন-চারবার আবেদন করেছিলাম, কিন্তু কার্ড পাইনি।”
মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। এ সময়ে নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও জীবিকার তাগিদে পদ্মায় মাছ ধরতে গিয়ে শুক্কুর মোল্লাসহ ১৩ জনকে আটক করেছে নৌ পুলিশ।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে। একদিকে ইলিশের প্রজনন রক্ষায় অভিযান, অন্যদিকে মাছ ধরতে না পারলে সংসার চলবে কীভাবে—এমন দুশ্চিন্তায় রয়েছেন জেলেদের পরিবারের সদস্যরা।
মাঝিরঘাট নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ কংকন কুমার বিশ্বাস জেলেদের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, সোমবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পদ্মা সেতু ও আহমেদ মাঝিরচর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়। পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার আওতাধীন মাঝিরঘাট নৌ পুলিশ ফাঁড়ি এ অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানে আনুমানিক সাড়ে ছয় হাজার মিটার জাল, পাঁচ কেজি ইলিশ ও তিনটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা ইলিশ স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় বিতরণ করা হয়েছে। আটক দুই শিশুর বয়স কম হওয়ায় মানবিক বিবেচনায় তাদের পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অন্য আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করে আদালতে পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ৩০ বছর বয়সী সুরুজ মৃধা। তাঁর বাড়ি জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের মাঝিকান্দি এলাকায়। তাঁর বাবা হাসেম মৃধা কৃষিকাজ করেন।
সুরুজ চার থেকে পাঁচ বছর ধরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে এত বছর মাছ ধরেও তিনি জেলে কার্ড পাননি বলে জানিয়েছেন। এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর মুঠোফোনের কভারের ভেতরে রাখা ১ হাজার ৯০০ টাকা এক পুলিশ সদস্য নিয়ে গেছেন।
সুরুজের অভিযোগ, নদী থেকে তাঁকে আটকের সময় নৌ পুলিশের এক সদস্য তাঁর মুঠোফোনটি নিয়ে নেন। ফোনের কভারের পেছনের দিকে ১ হাজার ৯০০ টাকা রাখা ছিল।
পরে তাঁদের নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হলে পরিবারের সদস্যদের আটকের বিষয়টি জানানোর জন্য তাঁকে মুঠোফোনটি দেওয়া হয়। ফোনটি হাতে পেয়ে তিনি দেখেন, কভারের ভেতরে রাখা ১ হাজার ৯০০ টাকা নেই। তবে নৌ পুলিশ সদস্যরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে মাঝিরঘাট নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ কংকন কুমার বিশ্বাস বলেন, “জেলেদের আটক করে নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আসার পর আমি তাঁদের জিজ্ঞেস করি, তাঁদের কাছে টাকা-পয়সা আছে কি না। থাকলে যেন আমাকে জানান। আর টাকা না থাকলে আমি নিজের টাকা দিয়ে তাঁদের নাশতা খাওয়াব। এ সময় জেলেরা আমাকে জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। তাঁরা নৌ পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনেছেন। এমন কিছু ঘটলে তাঁরা আমাকে বিষয়টি জানাতেন। তারপরও আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব।”
শরীয়তপুরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, দেশে ২২ দিনের ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা চলছে। শরীয়তপুরের পদ্মা ও মেঘনা নদীতেও এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। জেলেরা যাতে নদীতে মাছ ধরতে না যান, সে জন্য তাঁদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, শরীয়তপুর অঞ্চলের পদ্মা ও মেঘনা নদীতে ইলিশ আহরণকারী জেলের সংখ্যা ২৮ হাজার ৯২৯। এ বছর প্রত্যেক জেলেকে ২৫ কেজি করে মোট ৭২৩ মেট্রিক টন ভিজিএফের চাল দেওয়া হবে। চাল বিতরণ কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে।
জেলে কার্ড না পাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জেলে কার্ড পেতে উপজেলা কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হয়। জেলেদের আবেদনের ভিত্তিতে কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।









