চট্টগ্রামে নতুন ৪০০ পূজামণ্ডপ, নিরাপত্তায় ১৭ হাজারের বেশি সদস্য

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৯ পিএম
চট্টগ্রামে নতুন ৪০০ পূজামণ্ডপ, নিরাপত্তায় ১৭ হাজারের বেশি সদস্য

ছবি: বিডি মেইল

মো. কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি


চট্টগ্রামে এবারের শারদীয় দুর্গাপূজায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রায় ৪০০টি পূজামণ্ডপ। উৎসবকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করবেন ১২ হাজার আনসার সদস্য ও পাঁচ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য। পাশাপাশি গুজব, অপপ্রচার ও সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থেকে জেলার পূজামণ্ডপগুলোতে কার্যকর হবে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা।


বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে এসব তথ্য জানান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।


পরিদর্শনকালে বোয়ালখালীর বীণাপাণি পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গাকে অন্নপূর্ণা রূপে উপস্থাপনের ব্যতিক্রমী আয়োজন দেখে মুগ্ধ হন জেলা প্রশাসক। মণ্ডপের আলোকসজ্জা, কারুকাজ ও সৃজনশীল ভাবনার প্রশংসা করেন তিনি।


জেলা প্রশাসক বলেন, অনেক মন্দির ও পূজামণ্ডপ দেখেছেন তিনি। তবে বীণাপাণি পূজামণ্ডপের ভাবনা তাঁর কাছে আধুনিক ও ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। এতে আয়োজকদের মেধা ও সৃজনশীলতার অসাধারণ প্রকাশ ঘটেছে।


এবার বীণাপাণি পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গাকে অন্নপূর্ণা রূপে তুলে ধরেছেন আয়োজকেরা। এর মাধ্যমে মানুষের ক্ষুধা, অভাব-অনটন ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি প্রতীকীভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।


পূজামণ্ডপের সভাপতি প্রবীর চৌধুরী বলেন, হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অন্নপূর্ণা অন্ন ও প্রাচুর্যের দেবী এবং দেবী পার্বতীর একটি রূপ। এ আয়োজনে দেবী দুর্গাকে শুধু অসুরবিনাশিনী শক্তি হিসেবে নয়, বরং মানুষের জীবনরক্ষা, মমতা ও কল্যাণের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।


তিনি বলেন, “আমাদের মূল বার্তা হলো, পৃথিবীতে কেউ যেন ক্ষুধার্ত না থাকে, প্রতিটি ঘরে যেন খাবার থাকে।”


জেলা প্রশাসক বলেন, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভাব-অনটন ও প্রত্যাশাকে উপজীব্য করে মণ্ডপটি সাজানো হয়েছে। দেবী দুর্গার আগমনে মানুষের অভাব দূর হবে—এমন ভাবনা আয়োজনটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।


দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মানুষ এই মণ্ডপ পরিদর্শনে আসেন। তাঁদের সুবিধার্থে পর্যাপ্ত শীতলীকরণব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেন জেলা প্রশাসক। তাঁর মতে, আয়োজন যত সুন্দরই হোক, দর্শনার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে তা উপভোগ করতে না পারলে আয়োজনের সার্থকতা কমে যায়।


এর আগে জেলা প্রশাসক বোয়ালখালীর মেধসমুনি আশ্রম পরিদর্শন করেন। প্রায় ২৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত আশ্রমটির পূজার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা ঘুরে দেখেন তিনি।


চট্টগ্রামে বেড়েছে প্রায় ৪০০ পূজামণ্ডপ


জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এবারই প্রথম শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ উৎসবকে ঘিরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে চায় প্রশাসন।


তিনি জানান, এবার দুর্গাপূজায় সরকারি সহায়তার পরিমাণ ও আওতা বাড়ানো হয়েছে। সারা দেশে গতবারের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৫০০টি সর্বজনীন পূজামণ্ডপ বেড়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলাতেই নতুন মণ্ডপের সংখ্যা প্রায় ৪০০টি।


পূজার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিয়ে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করা হচ্ছে। কোথাও প্রস্তুতি বা নিরাপত্তায় ঘাটতি থাকলে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।


নিরাপত্তায় ১৭ হাজারের বেশি সদস্য


চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, দুর্গোৎসব ঘিরে নিরাপত্তার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থেকে জেলার সব পূজামণ্ডপে নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর হবে।


তিনি জানান, পূজামণ্ডপে পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি পুলিশের ভ্রাম্যমাণ টহল, সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং মণ্ডপের প্রবেশপথে নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে।


পুলিশ সুপার বলেন, “সবকিছু মিলিয়ে আমরা পূজামণ্ডপগুলোকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেব।”


পূজাকে কেন্দ্র করে গুজব, ভুয়া সংবাদ ও অপপ্রচার ছড়ানোর পাশাপাশি নাশকতার চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। এসব বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছে পুলিশ। প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, স্বেচ্ছাসেবকদের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


পুলিশ সুপার জানান, প্রতিমা বিসর্জন সূর্যাস্তের আগেই সম্পন্ন করতে আয়োজকদের অনুরোধ করা হয়েছে। প্রশাসন, পুলিশ ও পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কোনো অপশক্তি উৎসবের পরিবেশ নষ্ট করতে পারবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।


২০ অক্টোবর চট্টগ্রামে আসছেন প্রধানমন্ত্রী


আগামী ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রাম সফর করবেন বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। এ সময় নগরের জেমসন হলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসবের আয়োজনে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি পাওয়ার কথা জানান তিনি।


পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুর্গাপূজার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই প্রথম দুর্গাপূজা হওয়ায় উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


সবার সহযোগিতায় এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার।