কুড়িগ্রামে সারের কৃত্রিম সংকট নিয়ে বিক্ষোভ, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক
সূত্রঃ বিডি মেইল
শাহিন আহমেদ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
কুড়িগ্রামজুড়ে সারের কৃত্রিম সংকটকে কেন্দ্র করে কৃষকদের মধ্যে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও বিশৃঙ্খলার ঘটনায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান, মজুত করা সার উদ্ধার এবং সমন্বিতভাবে সার বিতরণের উদ্যোগ নেওয়ায় কৃষকদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
জেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যৌথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। প্রশাসনের দাবি, জেলায় সারের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। তবে অতিরিক্ত সার কেনার প্রবণতা এবং আগাম ফসলের জন্য সার মজুতের কারণে কিছু এলাকায় সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি রোপা আমন মৌসুমে ১৫ সেপ্টেম্বরের পর ইউরিয়া সার প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। তবে ভুট্টা, আলু ও বেগুনসহ পরবর্তী মৌসুমের ফসলের জন্য আগাম সার মজুতের চেষ্টা করায় সারের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
এদিকে সারের সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ডিলার পয়েন্টে কৃষকদের ভিড় বাড়ছে। সোমবার ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী ও রৌমারীর বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে শত শত কৃষককে সার সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও ঠেলাঠেলি ও বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটে।
রৌমারী উপজেলায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সার না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ কৃষকেরা একটি ডিলার পয়েন্টের গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। সোমবার সকাল ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে উপজেলার মহিলা কলেজপাড়া এলাকায় মেসার্স মিতা-হাসান এন্টারপ্রাইজের ডিলার পয়েন্টে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় কৃষক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বন্দবেড় ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডসহ আশপাশের এলাকার কৃষকেরা গভীর রাত থেকেই সেখানে সার নিতে জড়ো হতে থাকেন। সকাল হলেও সার বিতরণ শুরু না হওয়ায় অপেক্ষমাণ কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। পরে একপর্যায়ে উত্তেজিত কৃষকেরা গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
ডিলার মতিয়ার রহমান বলেন, তাঁদের গুদামে ৭৫০ বস্তা সার মজুত ছিল। সকালে প্রায় এক হাজার কৃষক সার নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। কে আগে সার নেবেন, তা নিয়ে ধাক্কাধাক্কির একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় গুদামে থাকা সার বিতরণ করা হয়।
রৌমারী উপজেলার মণ্ডলপাড়া গ্রামের কৃষক শফিউর রহমান বলেন, আমন চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সার মজুত ছিল এবং পর্যায়ক্রমে সবাই সার পেতেন। কিন্তু একটি মহলের উসকানিতে কেউ কেউ অতিরিক্ত সার মজুত করতে গেলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। পরে ওই সুযোগে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
ইছাকুড়ি গ্রামের কৃষক আব্দুল হান্নান বলেন, প্রশাসন ও সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সার নিয়ে এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল আলম বসুনিয়া বলেন, উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকেরা ধৈর্য ধরে সার উত্তোলন করলে কোনো সমস্যা হবে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আগামীকাল থেকে খোলাবাজারে সার বিক্রির ব্যবস্থা করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহবুবুল হাসান বলেন, তিনি নিজে বিভিন্ন সার ডিলার পয়েন্ট পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মাঠে রয়েছেন। একটি বিক্রয়কেন্দ্রে কিছুটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলেও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
অন্যদিকে সোমবার সকালে সার বিতরণকে কেন্দ্র করে ভূরুঙ্গামারী উপজেলায়ও উত্তেজনা দেখা দেয়। বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের ব্রিজপাড় এলাকায় সার বিতরণের স্লিপ দেওয়া নিয়ে অসন্তোষের জেরে কয়েকজন কৃষক বাঁশ ফেলে ও সড়কে আগুন জ্বালিয়ে ভূরুঙ্গামারী–সোনাহাট স্থলবন্দর সড়ক অবরোধ করেন। এতে সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বিএডিসি ডিলার মেসার্স আফি সার ঘরের আওতায় ২৩৫ বস্তা ডিএপি ও ৯৫ বস্তা টিএসপি সার বিতরণের জন্য স্লিপ দেওয়া হচ্ছিল। গনাইরকুটি গ্রামের মো. মালেক মিয়ার বাড়ির বাইরের আঙিনায় এ কার্যক্রম চলার সময় সারপ্রত্যাশী কৃষকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।
খবর পেয়ে ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজিম উদ্দিন ঘটনাস্থলে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দ্রুত সার দেওয়ার আশ্বাস দেন। পরে কৃষকেরা অবরোধ তুলে নেন।
এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃত দেব নাথ ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল হক তারেক ঘটনাস্থলে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন। নিয়ম মেনে সুষ্ঠুভাবে সার বিতরণ এবং প্রকৃত কৃষকদের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে সড়কে যান চলাচলও স্বাভাবিক হয়।
সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের একাধিক অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে অবৈধভাবে মজুত করা সার উদ্ধার এবং মজুতের দায়ে কয়েকজন ব্যবসায়ীকে মোট সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, জেলায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে। আগাম ভুট্টা ও বেগুন চাষের জন্য কৃষকেরা বাড়তি সার মজুত করায় কোথাও কোথাও সাময়িক সংকট তৈরি হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বয়ের মাধ্যমে সার বিতরণের চেষ্টা চলছে।
প্রশাসনের এমন উদ্যোগে জেলার সার পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এতে চলতি রোপা আমন মৌসুমে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সার পাওয়ার অনিশ্চয়তা কমছে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলনের আশাও বাড়ছে।








