কিশোর গ্যাং ও মাদকের ছোবলে বাগেরহাটের তারুণ্য

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম
কিশোর গ্যাং ও মাদকের ছোবলে বাগেরহাটের তারুণ্য

সূত্রঃ সংগৃহীত

প্রিন্স মন্ডল অলিফ, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি


সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি, নদী-খাল, সুন্দরবন ও ঐতিহ্যের জেলা বাগেরহাট। শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনে সম্ভাবনাময় এ জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে নানা সামাজিক সমস্যাও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে মাদকের বিস্তার এবং কিশোরদের অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকি বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলছে অভিভাবক ও সচেতন মহলকে।


জেলার বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক মাদকবিরোধী অভিযানেও পরিস্থিতির একটি চিত্র পাওয়া যায়। চলতি বছরের জুলাইয়ে ফকিরহাটে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে ৪ হাজার ১৫ পিস ইয়াবাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারদের একজনের বিরুদ্ধে ২৬টি মামলা রয়েছে।


এর আগে বাগেরহাট সদর উপজেলার কররী এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে ২ কেজি গাঁজা ও ২০ পিস ইয়াবাসহ একজনকে আটক করা হয়। একই মাসে বাগেরহাট সদর পৌরসভার দশানী এলাকায় র‌্যাবের অভিযানে ৩৩ কেজি গাঁজাসহ দুজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়।


শুধু বড় চালান নয়, ছোট ছোট চালানের মাধ্যমেও মাদক ছড়িয়ে পড়ছে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাগেরহাটে ১০ কেজি গাঁজাসহ তিনজনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে একজনের বয়স ছিল ১৮ বছর।


এসব অভিযান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার প্রমাণ হলেও একই সঙ্গে কিছু প্রশ্নও সামনে আনে। উদ্ধার হওয়া মাদকের কতটা ইতোমধ্যে তরুণদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে? মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত চক্রগুলো নতুন ক্রেতা, বাহক কিংবা সহযোগী হিসেবে কিশোরদের ব্যবহার করছে কি না—সেটিও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।


মাদকের সঙ্গে বাড়ছে অপরাধের ঝুঁকি


কিশোর বয়স মানুষের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এ সময়ে একজন কিশোর যেমন সহজে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ হতে পারে, তেমনি ভুল সঙ্গ, মাদক, অনলাইনভিত্তিক অপরাধী চক্র কিংবা অপরাধপ্রবণ বন্ধুদের সংস্পর্শে দ্রুত বিপথেও যেতে পারে।


কিশোরদের মধ্যে ‘গ্যাং’ সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। পরিবারে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, সন্তানের চলাফেরার ওপর নজরদারির অভাব, পারিবারিক অশান্তি, মাদকের সহজলভ্যতা, বেকারত্ব, হতাশা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং স্থানীয় অপরাধী চক্রের প্রভাব—এসব বিষয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে।


একজন কিশোর প্রথমে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে মাদকের সংস্পর্শে আসতে পারে। পরে মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে ছোটখাটো অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধী চক্র কিশোরদের ব্যবহার করতে পারে। বয়স ও সামাজিক অবস্থানের কারণে অনেক সময় তারা সহজে সন্দেহের তালিকায় না আসায় অপরাধীরা তাদের কাজে লাগানোর সুযোগ পায়।


তাই কিশোর গ্যাং ও মাদককে আলাদা দুটি সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। দুটির মধ্যে কোথায় এবং কীভাবে যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করাও জরুরি।


বাগেরহাটে প্রতিরোধের সুযোগ এখনো আছে


পরিস্থিতিকে শুধু হতাশার দৃষ্টিতে দেখার কারণ নেই। বাগেরহাটে প্রশাসন, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, মাদক নির্মূল ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন স্থানে বিশেষ চেকপোস্ট পরিচালনার কথা জানানো হয়েছে।


জেলা প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যেও মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি রয়েছে। তবে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদকের সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি এর চাহিদাও কমাতে হবে।


বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, ক্রীড়া সংগঠন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করতে হবে।


পরিবারই হতে পারে প্রথম প্রতিরোধক


একজন কিশোর হঠাৎ করে অপরাধী হয়ে ওঠে না। তার আচরণে আগে থেকেই কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। হঠাৎ অতিরিক্ত টাকা চাওয়া, রাত করে বাড়ি ফেরা, পড়াশোনায় অনাগ্রহ, নতুন ও সন্দেহজনক বন্ধুত্ব, পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি, অস্বাভাবিক রাগ বা অতিরিক্ত গোপনীয়তা—এসব পরিবর্তন অভিভাবকদের গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।


তবে সন্তানকে সন্দেহ বা শাস্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করাই বেশি কার্যকর। সন্তান যেন কোনো সমস্যায় পড়লে প্রথমে পরিবারের কাছেই নিজের কথা বলতে পারে, এমন পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং ও খেলাধুলা বাড়াতে হবে


কিশোরদের বড় একটি সময় কাটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তাই স্কুল-কলেজে নিয়মিত কাউন্সেলিং, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, স্কাউটিং ও সৃজনশীল কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন।


যেসব শিক্ষার্থী ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করছে, তাদের শুধু শাস্তি দিয়ে দূরে ঠেলে না দিয়ে কেন তারা এমন আচরণ করছে, সেটিও খুঁজে বের করতে হবে। প্রয়োজন হলে পরিবার ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় তাদের কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।


মাদক কারবারের মূল নেটওয়ার্কে নজর জরুরি


মাদকবিরোধী অভিযানে ব্যবহারকারী বা খুচরা বিক্রেতা গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মাদকের মূল সরবরাহকারী ও অর্থের উৎস শনাক্ত করা জরুরি। কারণ একজনকে গ্রেপ্তারের পর তার জায়গায় যদি আরেকজন সহজেই যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে সমস্যার মূল জায়গাটি অক্ষত থেকে যায়।


বাগেরহাটের ভৌগোলিক অবস্থানও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। জেলার সঙ্গে নদীপথ, সড়কপথ, উপকূলীয় অঞ্চল ও সুন্দরবনের যোগাযোগ রয়েছে। ফলে মাদকের সরবরাহ ও পরিবহন ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন।


কিশোরকে অপরাধী নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে হবে


কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন—এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। তবে একজন কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর তাকে শুধু অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করলে সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। তাকে কীভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়, সেই ব্যবস্থাও থাকতে হবে।


মাদকাসক্ত কিশোরদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে যারা এখনো অপরাধে জড়ায়নি কিন্তু ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে খেলাধুলা, কারিগরি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মমুখী কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।


বাগেরহাটে মাদকবিরোধী সহায়তার জন্য সরকারি মাদক নিয়ন্ত্রণ হটলাইন ১৬১১৩ রয়েছে।


এখনই সমন্বিত উদ্যোগের সময়


কিশোর গ্যাং ও মাদক কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নির্মূল করা সম্ভব নয়। পুলিশ অভিযান চালাবে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনা করবে, প্রশাসন সমন্বয় করবে—কিন্তু পরিবার যদি সন্তানের পাশে না থাকে এবং সমাজ যদি ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে না পারে, তাহলে স্থায়ী পরিবর্তন কঠিন।


তাই বাগেরহাটের প্রতিটি উপজেলা ও পৌর এলাকায় কিশোরদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম, খেলাধুলার আয়োজন, মাদকবিরোধী সভা, কাউন্সেলিং এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।


কারণ আজ যে কিশোরকে আমরা গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে দেখছি, সে-ই আগামী দিনে একজন শিক্ষক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা কিংবা সমাজের দায়িত্বশীল নাগরিক হতে পারে। তাকে অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনা শুধু একটি পরিবারকে রক্ষা করা নয়—রক্ষা করা ভবিষ্যৎ বাগেরহাটকে।


মাদকমুক্ত বাগেরহাট এবং কিশোর গ্যাংমুক্ত সমাজ গড়তে তাই প্রয়োজন শুধু অভিযান নয়; প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ।


এমকে/বিএম২৪