আবেদন ফরমেই যেন লাইসেন্স! কিশোরগঞ্জ শহরে ইজিবাইক-অটোর দৌরাত্ম্যে যানজট

প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম
আবেদন ফরমেই যেন লাইসেন্স! কিশোরগঞ্জ শহরে ইজিবাইক-অটোর দৌরাত্ম্যে যানজট

সংগৃহীত

মোঃ মাহ্ফুজুল হক খান (জিকু), কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি


কিশোরগঞ্জ শহরে যানজট নিরসনে প্রতিদিন নিরলসভাবে কাজ করছেন জেলা ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। তাঁদের সহযোগিতায় হলুদ গেঞ্জি পরিহিত কর্মীরাও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করছেন। তবে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ইজিবাইক, মিশুক, অটোরিকশা ও রিকশাভ্যান চলাচলের কারণে যানজট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। এর মধ্যে পৌরসভার লাইসেন্স ছাড়াই শুধু আবেদন ফরমের ফটোকপি গাড়িতে লাগিয়ে সড়কে চলাচলের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ পৌরসভার নির্ধারিত বৈধ অনুমোদনের আওতায় শহরে প্রায় ৬০০টি অটোরিকশা চলাচলের কথা। কিন্তু বাস্তবে এর চেয়ে অনেক বেশি ইজিবাইক, মিশুক ও অটোরিকশা শহরের বিভিন্ন সড়কে চলাচল করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে যানজট ও জনদুর্ভোগ।


গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ নতুন করে ইজিবাইক, রিকশাভ্যান ও অটোরিকশার লাইসেন্সের জন্য আবেদন ফরম বিতরণ শুরু করে। প্রতিটি ফরমের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার টাকা। পৌরসভা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার আবেদন ফরম বিতরণ করা হয়েছে।


অভিযোগ উঠেছে, অনেক চালক আবেদন ফরম সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার পর সেটির ফটোকপি গাড়িতে লাগিয়ে শহরের বিভিন্ন সড়কে চলাচল করছেন। অথচ আবেদন জমা দেওয়া মানেই লাইসেন্স পাওয়া নয়। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে পৌরসভার অনুমোদন এবং নির্ধারিত লাইসেন্স নম্বর পাওয়ার পরই একটি যানবাহন বৈধ অনুমোদনের আওতায় আসতে পারে।


এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক মো. ইসহাক মিয়া বলেন, লাইসেন্স পাওয়ার জন্য আবেদন ফরমটি কোনো লাইসেন্স নয়, এটি শুধুমাত্র আবেদনপত্র। পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই করে লাইসেন্স দেওয়া হবে এবং প্রতিটি লাইসেন্সের নির্দিষ্ট নম্বর থাকবে।


তিনি আরও বলেন, আবেদন ফরমের ফটোকপি গাড়িতে লাগিয়ে চলাচলের বিষয়ে পৌরসভা কাউকে কোনো অনুমতি দেয়নি। যারা এভাবে ফরমের কপি ব্যবহার করে গাড়ি চালাচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাদের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে এবং কখন লাইসেন্স বিতরণ করা হবে, তা পরবর্তীতে মাইকিংয়ের মাধ্যমে জানানো হবে।


অন্যদিকে, অতিরিক্ত ও অনুমোদনহীন যানবাহনের অবাধ চলাচলকে শহরের যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সচেতন নাগরিক ও শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, আবেদন ফরমের ফটোকপি ব্যবহার করে ইজিবাইক ও মিশুক শহরে চলাচল করায় যানবাহনের সংখ্যা আরও বাড়ছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও বাজার এলাকায় প্রতিদিনই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।


শহরে নিয়মিত চলাচলকারী একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, যানজট এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত এবং জরুরি প্রয়োজনে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।


এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ শহর যানবাহন পুলিশের পরিদর্শক আবু নাছের মো. জহির বলেন, কেউ আবেদন ফরম দিয়ে শহরের ভেতরে গাড়ি চালালে তা আইনগতভাবে বৈধ হবে না। যানবাহন চলাচলের জন্য অবশ্যই পৌরসভা থেকে যথাযথ লাইসেন্স নিতে হবে। শুধু আবেদন ফরমের ফটোকপি দিয়ে গাড়ি চালানোর কোনো বৈধতা নেই। এভাবে চলাচলকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ১৬ ধারায় মোটরযানের নিবন্ধন এবং ২৮ ধারায় রুট পারমিটসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। একই আইনের ৭২ ধারায় প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে রুট পারমিট ছাড়া পরিবহনযান চালানোর শাস্তির বিধান উল্লেখ রয়েছে। তবে যানবাহনের শ্রেণি ও চলাচলের অনুমতির ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিধান প্রযোজ্য হবে। পৌরসভার আবেদন ফরম নিজে কোনো চূড়ান্ত লাইসেন্স বা চলাচলের অনুমতিপত্র নয়।


এদিকে কিশোরগঞ্জ শহরের গৌরাঙ্গবাজার, পুরানথানা, স্টেশন রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপে প্রতিদিন স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের।


জনদুর্ভোগ কমাতে পৌরসভার বিতরণ করা আবেদন ফরমগুলো যথাযথ যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত যোগ্য যানবাহনকে লাইসেন্সের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। পাশাপাশি লাইসেন্স অনুমোদনের আগেই আবেদন ফরমের ফটোকপি ব্যবহার করে চলাচলকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া, শহরে যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।


কিশোরগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, ট্রাফিক পুলিশের নিরলস প্রচেষ্টার পাশাপাশি পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে শহরে স্বাভাবিক যান চলাচল ফিরবে। আবেদন ফরম যেন কোনোভাবেই লাইসেন্সের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করার দাবি এখন সবার।


এমকে/বিএম২৪