চরাঞ্চলে শিক্ষক সংকট: একজন শিক্ষক দিয়েই চলছে বহু বিদ্যালয়

প্রকাশিত: ২২ জুন ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম
চরাঞ্চলে শিক্ষক সংকট: একজন শিক্ষক দিয়েই চলছে বহু বিদ্যালয়

শাহীন আহমেদ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চরাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে তীব্র শিক্ষক সংকটে ভুগছে। অনেক বিদ্যালয়ে মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে পাঁচটি শ্রেণির পাঠদান পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কমছে এবং ঝরে পড়ার হারও বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চললেও সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

সরেজমিনে উপজেলার অষ্টমীরচর ইউনিয়নের চর মুদাফৎ কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সহকারী শিক্ষক সাইদ মোহাম্মদ সা'দ একাই পাঁচটি শ্রেণির পাঠদান পরিচালনা করছেন। বিদ্যালয়টিতে কাগজে-কলমে তিনজন শিক্ষক থাকার কথা। তাঁদের মধ্যে একজন বিটিপিটি প্রশিক্ষণে রয়েছেন। অপরদিকে প্রধান শিক্ষক জিয়ারা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত।

হাজিরা খাতা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত না থাকলেও মাসের পর মাস সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। উপজেলা শিক্ষা অফিসে তাঁর কোনো অনুমোদিত ছুটির নথিও পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে চিলমারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, “প্রধান শিক্ষক জিয়ারা খাতুন কোনো ছুটি নেননি। তাঁকে এর আগে একবার কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছিল। আজ আবারও তাঁকে শোকজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

একই ইউনিয়নের মুদাফৎ কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম একাই তিনটি শ্রেণির পাঠদান করছেন। একই সঙ্গে দাপ্তরিক কার্যক্রম, মিডডে মিলের হিসাব এবং অনলাইনভিত্তিক সব কাজও তাঁকেই সামলাতে হচ্ছে।

বিদ্যালয়টির অপর শিক্ষক মাসুমা আক্তার ২০২৩ সালে যোগদানের পর মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে বর্তমানে চিলমারী শহরের একটি বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে কর্মরত রয়েছেন। মাত্র দুজন শিক্ষকের একটি বিদ্যালয় থেকে একজনকে শহরে ডেপুটেশনে দেওয়ায় স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেক বলেন, “আমার দায়িত্বকালে এই বিদ্যালয়ে প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী ছিল। এখন শিক্ষক সংকটের কারণে সেই সংখ্যা কমে ১৫৭ জনে নেমে এসেছে।”

দক্ষিণ নটারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ২০২২ সাল থেকে বিদ্যালয়টি মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন দুপুর ১২টার মধ্যেই পাঠদান শেষ করে ছুটি ঘোষণা করতে হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের একমাত্র শিক্ষক রোজিনা বেগম বলেন, “চিলমারী থেকে আগে কয়েকজন শিক্ষক এখানে এসেছিলেন। কিন্তু চরাঞ্চলের যাতায়াত ও জীবনযাপনের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তাঁরা অল্পদিনের মধ্যেই বদলি নিয়ে চলে যান। চরাঞ্চলের শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের নিয়োগ দিলে বিদ্যালয়গুলো স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।”

স্থানীয় শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, চিলমারী উপজেলার চরাঞ্চলের ২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে নয়ারহাট ইউনিয়নের খেরুয়ারচর ও চিলমারী ইউনিয়নের মনতলাসহ প্রায় এক ডজন বিদ্যালয় মাত্র দুই থেকে তিনজন শিক্ষক দিয়ে কোনোমতে পরিচালিত হচ্ছে। উপজেলার মোট ৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমানে ৭৪টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে, যার অধিকাংশই চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায়চৌধুরী বলেন, চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোর সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের দাবি, শূন্য পদে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, দুর্গম এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এসব বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষার মান আরও অবনতি ঘটবে।