​লাশের মিছিলে তরুণের উল্লাস: ঔপনিবেশিক শিক্ষার বিষবৃক্ষ ও আমাদের চেতনা বিকৃতি ​

প্রকাশিত: ১২ জুলাই ২০২৬, ১১:১২ পিএম
​লাশের মিছিলে তরুণের উল্লাস: ঔপনিবেশিক শিক্ষার বিষবৃক্ষ ও আমাদের চেতনা বিকৃতি ​

​একদিকে প্রকৃতির নিষ্ঠুর থাবায় লণ্ডভণ্ড চট্টগ্রাম। বন্যায় একের পর এক মানুষ মারা যাচ্ছে, পানির তোড়ে ভেসে যাচ্ছে মানুষের নিথর লাশ। স্বজন হারানোর আর্তনাদ আর বাঁচার আকুতিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস। আর ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে এলো অন্য এক পরাবাস্তব দৃশ্য। দেশের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী সেই দুর্যোগের বৃষ্টিতে ভিজেই মেতে উঠেছেন খেলা দেখার উল্লাসে!


​এই বৈপরীত্য দেখে যে কারো মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিকআমরা আসলে কেমন সমাজ গড়ে তুলছি? আমাদের তরুণদের সংবেদনশীলতা আর সহমর্মিতা কি তবে বিলুপ্তির পথে? তবে একটু গভীরে তাকালে বুঝবেন, দায়টা কেবল ওই শিক্ষার্থীদের একার নয়। এই উদাসীনতা আসলে একটি দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধির বহিঃপ্রকাশ। এর আসল গলদ আমাদের ঘুণে ধরা শিক্ষা কারিকুলাম ও সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার গভীরে। যে শিক্ষা ব্যবস্থা দেশের সংকটে তরুণ প্রজন্মকে চারপাশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায় না, সেই শিক্ষার সনদ দিয়ে একটি জাতি আসলে কোথায় যাবে?


​আমাদের এই সংকটের শিকড় আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে পোঁতা হয়েছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা এ দেশে এসে কেবল আমাদের নিজস্ব স্বনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করেনি, তারা আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে গেছে। তারা আমাদের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ লুটপাট করে নিয়ে গেছে সত্য, কিন্তু তার চেয়েও বড় ক্ষতি করেছে আমাদের চিন্তার জগতকে পরাধীন করে। ব্রিটিশ শোষকরা এ দেশে এমন এক কেরানি তৈরির শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছিল, যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল মানুষকে পরনির্ভরশীল, আত্মকেন্দ্রিক এবং শোষকদের অনুগত গোলাম বানানো।


​উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় সেই শোষকেরা আমাদের উপহার দিয়ে গেছে এক দীর্ঘমেয়াদী বিষবৃক্ষ। যার ফলশ্রুতিতে স্বাধীন দেশে বাস করেও আমাদের সমাজ আজ অশিক্ষা, দারিদ্র্য, কুসংস্কার আর পরনির্ভরশীলতার বেড়াজালে বন্দী। এই শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের উপহার দিয়েছে এক অন্ধ 'বিদেশ-প্রেম', যেখানে নিজের দেশের চেয়ে পাশ্চাত্যের অনুকরণকে শ্রেষ্ঠ মনে করা হয়। এর হাত ধরেই সমাজ ও রাষ্ট্রে জেঁকে বসেছে ঘুষ, দুর্নীতি, চুরি, বাটপারি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো ব্যাধি।


​সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই ব্যবস্থা আমাদের চিন্তা ও মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটিয়েছে। জাতীয় দুর্যোগ বা সংকটের দিনেও যখন সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা, তখন আমাদের তরুণ সমাজ ব্যস্ত থাকে সস্তা বিনোদন আর অকাজে সময় নষ্ট করতে। শিক্ষার হার বা জিপিএ-৫ এর সংখ্যা হয়তো বাড়ছে, কিন্তু কমছে মানবিক মূল্যবোধ আর দেশপ্রেম।


​ব্রিটিশ শোষকরা সশরীরে এ দেশ থেকে বিদায় নিয়েছে বহু বছর আগে, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া সেই "ভাগ করো এবং শাসন করো" (Divide and Rule) নীতি আর আত্মকেন্দ্রিক শিক্ষার ভূত আজও আমাদের মগজ থেকে নামেনি। এই ঔপনিবেশিক মানসিকতার দাসত্ব থেকে যতদিন না আমরা বের হতে পারব, যতদিন না আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে গণমুখী, স্বনির্ভর ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা যাবে—তদদিন এই জাতির প্রকৃত মুক্তি অসম্ভব।


​সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই যদি শিক্ষার প্রথম পাঠ না হয়, তবে সেই শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তা না হলে আমরা কোনোদিনও স্বনির্ভর ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না।


লেখা:

মোঃ জাহেরুল ইসলাম 

শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ