১৫ জুলাই: যেদিন নীরবতা ভেঙে শুরু হয়েছিল প্রতিরোধ
১৪ জুলাই, রাত প্রায় ৩টা। টিএসসি থেকে বাসায় ফিরে অল্প কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে রাতে খাবার খেয়ে ফজর পড়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম থেকে উঠে আবার কলেজের উদ্দেশে রওনা হই। লক্ষ্য একটাই—চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা। ঢাকা কলেজ থেকে যখন মিছিল বের হয়, তখন তৎকালীন নিউমার্কেট থানা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও আন্দোলনের সমন্বয়ক তাওহীদ ভাইয়ের সঙ্গে আমিও উপস্থিত ছিলাম। তবে একটি জরুরি কাজে ডিপার্টমেন্ট এ যেতে হওয়ায় ফিরে এসে দেখি মিছিল ইতোমধ্যেই চলে গেছে। ফলে সেদিন আর টিএসসিতে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
পরে বন্ধু রাগিব উমর রাইয়ানের সঙ্গে ক্যাম্পাসে কিছু সময় কাটিয়ে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে সদরঘাটের উদ্দেশে সাভার পরিবহনের একটি বাসে উঠি। উদ্দেশ্য ছিল রাগিবের মামার দোকানে গিয়ে আমার মোবাইল ফোনটি ঠিক করানো। সেদিন প্রচণ্ড যানজট ছিল। দুপুর ২টা ৩০ মিনিটের দিকে বাসে উঠলেও সদরঘাটে পৌঁছাই আছরের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার কাছাকাছি সময়ে। তবে বাসে বসেই সংবাদ দেখতে গিয়ে বুকটা হাহাকার করে উঠল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস হামলা চালিয়েছে। অসংখ্য ভাই আহত হয়েছেন, আর আমাদের বোনদের ওপর চালানো হয়েছে অমানবিক নির্যাতন। সেই দৃশ্য আজও চোখে ভাসে।
সদরঘাটে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই কলাবাগান পূর্ব থানা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি মামুন ভাই (বর্তমানে শাখা অর্থ সম্পাদক) ফোন করলেন। শাখা সভাপতির নির্দেশ জানিয়ে তিনি বললেন, আমি যেখানেই থাকি না কেন, ৩০ মিনিটের মধ্যে হাজী রেস্টুরেন্টে পৌঁছাতে হবে। কারণ আহত ভাইদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেওয়া হচ্ছে না, আর শহীদুল্লাহ হলে ছাত্রলীগ নামের সন্ত্রাসীরা অনেক আহত ভাইকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তাঁদের উদ্ধার করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আমি সঙ্গে সঙ্গে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। ঠিক তখনই আবার মামুন ভাইয়ের ফোন। আমাকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হলো—ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের পরিস্থিতি এবং চাঁনখারপুল এলাকার সার্বিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া।
আমি সেখানে পৌঁছানোর আগেই তৎকালীন সাহিত্য সম্পাদক আব্দুল্লাহ ভাই ফোন করে জানতে চাইলেন, বাসায় কতগুলো কাঠের স্টাম্প আছে। আমি বললাম, ছয়টি। তিনি নির্দেশ দিলেন, আশপাশের থানার বাসাগুলো থেকে আরও স্টাম্প সংগ্রহ করতে, প্রয়োজনে কিনে হলেও দ্রুত চাঁনখারপুলে পৌঁছে দিতে হবে।
অন্যদিকে তৎকালীন থানা সেক্রেটারি এটিএম নোমান, অর্থ সম্পাদক মোক্তার, ওয়ার্ড সভাপতি অর্ণব অন্যান্য জনশক্তিদের নিয়ে স্টাম্পসহ নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে যান। এরপর বিভিন্ন মহানগরের দায়িত্বশীল ভাইদের সঙ্গে ঢাকা কলেজ ছাত্রশিবিরের দায়িত্বশীল এবং জনশক্তিরা ঐক্যবদ্ধভাবে অভিযান পরিচালনা করেন। অবরুদ্ধ শহীদুল্লাহ হল থেকে আহত ভাইদের উদ্ধার করা হয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হয়।
সেদিনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক এবং দায়িত্ববোধের এক কঠিন পরীক্ষা। কে বাঁচবে, কে শহীদ হবে—কেউই জানতাম না। তবু ভয়কে পেছনে ফেলে আমরা ছুটেছিলাম একটাই বিশ্বাস নিয়ে—আহত ভাইদের পাশে দাঁড়াতে হবে, অন্যায়ের সামনে মাথা নত করা যাবে না।
ইতিহাসের পাতায় হয়তো আমাদের নাম লেখা থাকবে না। কিন্তু ১৪ জুলাইয়ের সেই দীর্ঘ রাত, আহত ভাইদের আর্তনাদ, দায়িত্বের ডাক এবং একে অপরের জন্য জীবন বাজি রেখে ছুটে চলার স্মৃতিগুলো আজীবন হৃদয়ের গভীরে অমলিন হয়ে থাকবে।
লেখা:
তৈয়ব হাসান তাহসিন
ক্রীড়া ও সমাজসেবা সম্পাদক
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির,
ঢাকা কলেজ শাখা









