কাউকে ভালোবাসতে গিয়ে নিজের প্রতি যত্ন হারাবেন না

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম
কাউকে ভালোবাসতে গিয়ে নিজের প্রতি যত্ন হারাবেন না

মানুষ চাহিদাগত ভাবে ভালোবাসার টান অনুভব করে। এমন একজন মানুষও খুঁজে পাওয়া কঠিন, যে কখনো কারও ভালোবাসা চায়নি। শৈশবে বাবা-মায়ের স্নেহ, কৈশোরে বন্ধুত্বের সাহচর্য, যৌবনে প্রিয় মানুষের হাত, আর বার্ধক্যে সন্তানদের মমতা- জীবনের প্রতিটি ধাপেই ভালোবাসা মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। কিন্তু ভালোবাসার এই গভীর আকাঙ্ক্ষাই অনেক সময় মানুষকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়। যেখানে সে ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা, স্বপ্ন এবং সুখকে বিসর্জন দিতে শুরু করে।

সাধারণত কাউকে ভালোবাসা অপরাধ নয়। বরং ভালোবাসা মানুষের সবচেয়ে নির্মল অনুভূতিগুলোর একটি। কিন্তু সেই ভালোবাসা যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে আপনি নিজের খাওয়া-দাওয়া ভুলে যান, নিজের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করেন, নিজের পরিবার থেকে দূরে সরে যান, নিজের স্বপ্ন ত্যাগ করেন কিংবা নিজের আত্মসম্মানকে প্রতিদিন একটু একটু করে হত্যা করেন- তাহলে সেটি আর সুস্থ ভালোবাসা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে আত্মবিনাশের সূচনা।

ভালোবাসার সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো- "আমি তার জন্য সবকিছু করতে পারি।" এই "সবকিছু" শব্দটাই বিপজ্জনক। কারণ সবকিছু করতে গিয়ে মানুষ একসময় নিজের জন্য কিছুই অবশিষ্ট রাখে না। সে ভুলে যায়, নিজের প্রতি দায়িত্বও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যে মানুষ নিজেকে ভালোবাসতে পারে না, সে অন্য কাউকেও দীর্ঘদিন সুস্থভাবে ভালোবাসতে পারে না।

আমরা প্রায়ই দেখি, কেউ একজন সম্পর্কের জন্য নিজের ক্যারিয়ার ছেড়ে দেয়। কেউ বন্ধু হারায়। কেউ নিজের শখ, প্রতিভা, পড়াশোনা, এমনকি মানসিক সুস্থতাও বিসর্জন দেয়। শুরুতে এগুলো ত্যাগ বলে মনে হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো আফসোসে পরিণত হয়।

একজন মানুষ যদি প্রতিদিন নিজের ইচ্ছাকে হত্যা করতে করতে শুধুই অন্যের ইচ্ছা পূরণ করতে থাকে, তাহলে একদিন সে নিজেকেই চিনতে পারবে না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হবে- "আমি কোথায় হারিয়ে গেলাম ?"

সুস্থ ভালোবাসা কখনো আপনাকে হারিয়ে যেতে শেখায় না। বরং আপনাকে আরও শক্তিশালী, আরও আত্মবিশ্বাসী এবং আরও সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। যে সম্পর্ক আপনাকে নিজের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়, সেটি ভালোবাসা নয়; সেটি নির্ভরশীলতা কিংবা মানসিক বন্দিত্ব হতে পারে।

আজকের সমাজে একটি বড় সমস্যা হলো- অনেকেই ভালোবাসাকে আত্মত্যাগের প্রতিযোগিতা মনে করেন। কে বেশি কাঁদতে পারে, কে বেশি সহ্য করতে পারে, কে বেশি নিজের ক্ষতি করতে পারে- এসব যেন ভালোবাসার প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ প্রকৃত ভালোবাসা কখনো প্রমাণ চায় না; সেটি সম্মান, বিশ্বাস ও যত্নের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

অনেক সম্পর্কেই দেখা যায়, একজন মানুষ সবসময় দিচ্ছেন, আর অন্যজন শুধু নিচ্ছেন। একজন রাত জেগে অপেক্ষা করছেন, অন্যজন ব্যস্ততার অজুহাত দিচ্ছেন। একজন নিজের সব পরিকল্পনা বাতিল করছেন, অন্যজন নিজের সুবিধামতো সম্পর্ক চালাচ্ছেন। এ ধরনের একতরফা সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে।

ভালোবাসার নামে যদি প্রতিদিন আপনাকে নিজের মূল্য কমিয়ে ফেলতে হয়, তবে সেই সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার। কারণ ভালোবাসা কখনো কাউকে ছোট করে না; ভালোবাসা মানুষকে বড় করে।

নিজের প্রতি যত্ন নেওয়া কোনো স্বার্থপরতা নয়। বরং এটি মানসিক পরিপক্বতার লক্ষণ। আপনি যদি নিয়মিত নিজের শরীরের যত্ন নেন, মানসিক শান্তির জন্য সময় বের করেন, নিজের দক্ষতা বাড়ান, পরিবারকে সময় দেন, নিজের স্বপ্ন নিয়ে কাজ করেন- তাহলে আপনি আরও পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবেন। আর একজন পরিপূর্ণ মানুষই একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

অনেকেই মনে করেন, "আমি যদি নিজেকে গুরুত্ব দিই, তাহলে হয়তো সে ভাববে আমি তাকে কম ভালোবাসি।" বাস্তবতা ঠিক উল্টো। যে মানুষ নিজের সীমা, মূল্য ও আত্মসম্মান বোঝে, তাকে সাধারণত অন্যরাও সম্মান করতে শেখে।

সম্পর্কে সীমারেখা থাকা জরুরি। সব সময় ফোন ধরতেই হবে, সব সিদ্ধান্তে সায় দিতেই হবে, নিজের ব্যক্তিগত সময় থাকবে না- এসব ধারণা সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ নয়। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব একটি পৃথিবী থাকে। সেই পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রেখেই ভালোবাসতে হয়।

মনে রাখতে হবে, আপনার জীবন কেবল একটি সম্পর্কের জন্য নয়। আপনার পরিবার আছে, বন্ধু আছে, কর্মজীবন আছে, সমাজ আছে, স্বপ্ন আছে, এবং সবচেয়ে বড় কথা- আপনি নিজে আছেন। যদি এই "নিজেকে" হারিয়ে ফেলেন, তাহলে একদিন ভালোবাসাও আপনাকে পূর্ণতা দিতে পারবে না।

জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি গুলোর একটি হলো, অনেক মানুষ বছরের পর বছর অন্যকে সুখী করতে গিয়ে নিজে কষ্টে ডুবে থাকে। তারা মনে করে, একদিন হয়তো সব বদলে যাবে। কিন্তু সব সম্পর্ক বদলায় না। অনেক সময় বদলায় শুধু মানুষের বয়স, শক্তি আর স্বপ্ন।

তাই ভালোবাসুন, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব মুছে দিয়ে নয়। যত্ন নিন, কিন্তু নিজের ক্ষতি করে নয়। পাশে থাকুন, কিন্তু নিজের পথ হারিয়ে নয়। কারণ আপনি যদি নিজেই ভেঙেপড়েন, তাহলে অন্যকে আগলে রাখার শক্তিও একদিন থাকবে না।

অনেক মানুষ মনে করেন, ভালোবাসা মানেই নিজেকে উৎসর্গ করে দেওয়া। কিন্তু বাস্তব জীবন বারবার প্রমাণ করেছে, যে ভালোবাসা নিজের অস্তিত্বকে ধ্বংস করে, সেটি কখনো দীর্ঘস্থায়ী সুখ এনে দিতে পারে না। কারণ ভালোবাসা কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়, যেখানে একজন জয়ী হবে আর অন্যজন পরাজিত হবে। প্রকৃত ভালোবাসা এমন একটি আশ্রয়, যেখানে দুজন মানুষই নিরাপদ, সম্মানিত এবং মানসিকভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়।

সম্পর্কের শুরুতে মানুষ সাধারণত নিজের সেরা দিকগুলোই তুলে ধরে। প্রিয় মানুষকে খুশি করার জন্য অতিরিক্ত সময় দেয়, নিজের পছন্দ-অপছন্দ গোপন করে, এমনকি নিজের কষ্টও প্রকাশ করতে চায় না। শুরুতে এগুলো স্বাভাবিক মনে হলেও, যখন এটি অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন মানুষ নিজের প্রকৃত সত্তাকে হারাতে শুরু করে।

ধীরে ধীরে সে এমন একজন মানুষে পরিণত হয়, যে সব সময় অন্যের মন রক্ষা করতে ব্যস্ত। সে নিজের দুঃখ লুকিয়ে রাখে, নিজের অপমানকে ক্ষমা বলে চালিয়ে দেয়, নিজের স্বপ্নকে ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখে। অথচ সেই ‘ভবিষ্যৎ’ অনেক সময় আর আসে না।

কেউ একদিনে নিজের আত্মসম্মান হারায় না। এটি ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়।

প্রথমে সে নিজের মতামত প্রকাশ করা কমিয়ে দেয়।

তারপর নিজের পছন্দের কাজগুলো বাদ দেয়।

এরপর নিজের বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যায়।

পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়।

সবশেষে সে নিজেকেই ভুলে যায়।

এই পরিবর্তনগুলো এত ধীরে ঘটে যে মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না সে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে।

একটি সুস্থ সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান। যদি আপনাকে প্রতিনিয়ত ভালোবাসা পাওয়ার জন্য অনুরোধ করতে হয়, গুরুত্ব পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় কিংবা নিজের মূল্য প্রমাণ করতে হয়, তাহলে সেখানে সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে।

ভালোবাসা এমন হওয়া উচিত, যেখানে দুজনই একে অপরকে মূল্য দেয়। কেউ কারও দাস নয়, আবার কেউ কারও মালিকও নয়।

পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ সম্পর্কের কারণে নিজেদের ক্যারিয়ার, শিক্ষা, প্রতিভা কিংবা জীবনের লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে। কেউ লেখালেখি ছেড়েছে, কেউ গান, কেউ উচ্চশিক্ষা, কেউ ব্যবসা, কেউ সামাজিক কাজ।

অনেক বছর পর যখন সেই সম্পর্ক আর থাকে না, তখন মানুষ উপলব্ধি করে- সে শুধু একজন মানুষকেই হারায়নি, নিজের ভবিষ্যৎকেও হারিয়েছে।

ভালোবাসা যদি আপনার স্বপ্নকে মেরে ফেলে, তবে সেটি ভালোবাসার উদ্দেশ্য পূরণ করছে না।

প্রকৃত ভালোবাসা আপনাকে আরও বড় হতে সাহায্য করবে। আপনার সাফল্যে আনন্দ পাবে। আপনার উন্নতিকে ভয় পাবে না।

সব নির্যাতনের দাগ শরীরে দেখা যায় না। অনেক নির্যাতন শুধু হৃদয়ে জমে থাকে।

যেমন- 

* সব সময় আপনাকে অপরাধী অনুভব করানো।

* আপনার সাফল্যকে ছোট করে দেখা।

* আপনার অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেওয়া।

* বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে বাধা দেওয়া।

* সব সময় আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা।

অনেকেই এসবকে ভালোবাসার প্রকাশ মনে করেন। বাস্তবে এগুলো মানসিক নিয়ন্ত্রণের লক্ষণ হতে পারে।

অনেক মানুষ সম্পর্কের সমস্যায় খাওয়া বন্ধ করে দেন, রাত জেগে থাকেন, ঘুম হারিয়ে ফেলেন, অসুস্থ হলেও চিকিৎসা নেন না।


কিন্তু মনে রাখতে হবে, আপনার শরীর আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ।


আপনি অসুস্থ হয়ে পড়লে শুধু একটি সম্পর্ক নয়, আপনার পরিবার, সমাজ, কর্মজীবন- সবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।


তাই ভালোবাসার জন্য নিজের স্বাস্থ্য নষ্ট করা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।


যে ব্যক্তি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে, নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারে এবং নিজের জীবনকে সম্মান করে, তাকে মানুষ সাধারণত বেশি গুরুত্ব দেয়।


অন্যদিকে যে ব্যক্তি নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে শুধু একজন মানুষের চারপাশে ঘুরতে থাকে, তাকে অনেক সময় অবহেলার শিকার হতে হয়।


এটি নির্মম শোনালেও বাস্তব জীবনে এমন উদাহরণ অসংখ্য।

প্রিয় মানুষকে ভালোবাসার অর্থ তাকে বন্দি করা নয়।

আবার নিজের স্বাধীনতাও হারিয়ে ফেলা নয়।

একটি সুস্থ সম্পর্ক এমন হবে, যেখানে দুজন মানুষ একে অপরের পাশে থেকেও নিজস্ব পরিচয় ধরে রাখতে পারবে।

সে তার পরিবারকে সময় দেবে।

আপনি আপনার কাজ করবেন।

সে তার স্বপ্ন পূরণ করবে।

আপনি আপনার লক্ষ্য অর্জনের পথে হাঁটবেন।

তারপরও দুজনের সম্পর্ক অটুট থাকবে।

এটাই পরিণত ভালোবাসা।

অনেক মানুষ শুধু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য সবকিছু মেনে নেন।

কিন্তু জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- প্রয়োজনে ‘না’ বলতে জানতে হবে।

যদি কোনো অনুরোধ আপনার আত্মসম্মান নষ্ট করে, আপনার নীতি ভঙ্গ করে বা আপনার ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে বিনয়ের সঙ্গে ‘না’ বলা দুর্বলতা নয়; এটি আত্মসম্মানের প্রকাশ।

আপনার জীবনে অনেক মানুষ আসবে, আবার চলে যাবে।

কিন্তু একজন মানুষ কখনো আপনাকে ছেড়ে যাবে না- তিনি আপনি নিজে।

তাই নিজের সঙ্গে সম্পর্কটিকে সবচেয়ে সুন্দর রাখুন।

নিজেকে ক্ষমা করুন।

নিজেকে সময় দিন।

নিজের ভুল থেকে শিখুন।

নিজের সাফল্য উদ্‌যাপন করুন।

নিজেকে ছোট করবেন না।

কারণ যে মানুষ নিজের মূল্য বোঝে, সে অন্যের মূল্যও ভালোভাবে বুঝতে পারে।

কাউকে ভালোবাসা জীবনের সৌন্দর্য, কিন্তু নিজের প্রতি ভালোবাসা জীবনের ভিত্তি। ভিত্তি দুর্বল হলে সবচেয়ে সুন্দর ভবনও একদিন ভেঙে পড়ে। তাই সম্পর্কের জন্য ত্যাগ করুন, কিন্তু আত্মবিসর্জন নয়; আপস করুন, কিন্তু আত্মসম্মান বিক্রি করে নয়; ভালোবাসুন, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে নয়।

জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যগুলোর একটি হলো- কোনো সম্পর্কই মানুষের পুরো জীবন নয়। একটি সম্পর্ক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটিই জীবন নয়। অনেকেই এই সত্যটি বুঝতে পারেন তখন, যখন তারা একটি সম্পর্কের জন্য নিজেদের অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছেন। তখন ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, যদি একটু নিজের কথাও ভাবতাম, যদি একটু নিজের শরীর, মন, পরিবার, স্বপ্ন আর আত্মসম্মানের প্রতিও যত্নবান হতাম, তাহলে হয়তো জীবন এতটা কঠিন হয়ে উঠত না।

ভালোবাসার প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন দুজন মানুষ একে অপরের শক্তি হয়ে ওঠে। একজন অন্যজনকে ভেঙে দেয় না; বরং গড়ে তোলে। একজন অন্যজনের পথ রুদ্ধ করে না; বরং সামনে এগিয়ে যেতে সাহস দেয়। যে সম্পর্ক আপনাকে প্রতিদিন আরও ছোট করে, আপনার আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়, আপনাকে নিজের কাছেই অপরিচিত করে তোলে- সেই সম্পর্কের নাম ভালোবাসা নয়, বরং মানসিক ক্লান্তি।

অনেক মানুষ ভাবেন, "আমি যদি নিজেকে পুরোপুরি তার জন্য উৎসর্গ করি, তাহলে সে আমাকে আরও বেশি ভালোবাসবে।"

বাস্তবতা সব সময় এমন হয় না।

বরং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যে মানুষ নিজের সম্মান, ব্যক্তিত্ব ও স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে, তাকে ধীরে ধীরে গুরুত্ব দেওয়াও কমে যায়। কারণ মানুষ সাধারণত সেই ব্যক্তিকেই সম্মান করে, যিনি নিজেকেও সম্মান করেন।

নিজেকে হারিয়ে যে ভালোবাসা অর্জন করতে হয়, সেই ভালোবাসা কখনো স্থায়ী শান্তি দেয় না।

একটি সুস্থ সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ভারসাম্য।

যদি একজন সব সময় ত্যাগ করেন আর অন্যজন শুধু গ্রহণ করেন, তবে সেই সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে।

যদি একজন সব সময় ক্ষমা চান, আর অন্যজন কখনো নিজের ভুল স্বীকার না করেন, তবে সেখানে সমতা থাকে না।

যদি একজন সব সময় সম্পর্ক বাঁচানোর চেষ্টা করেন আর অন্যজন উদাসীন থাকেন, তবে সেই সম্পর্ক একদিন ভেঙে পড়বেই।

ভালোবাসা কখনো একতরফা দায়িত্ব হতে পারে না।

নিজের জন্য সময় বের করা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানসিক সুস্থতার অপরিহার্য অংশ।

বই পড়ুন।

হাঁটুন।

নামাজ, প্রার্থনা বা ধ্যান করুন- যে বিশ্বাসই অনুসরণ করুন না কেন, আত্মিক প্রশান্তির জন্য সময় রাখুন।

পরিবারের সঙ্গে কথা বলুন।

পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।

নতুন কিছু শিখুন।

নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করুন।

এই কাজগুলো আপনাকে শুধু একজন ভালো মানুষই বানাবে না, বরং একজন পরিণত সঙ্গী হিসেবেও গড়ে তুলবে।

মানুষ ভুল করতেই পারে। সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝিও হতে পারে। তাই ক্ষমা একটি মহৎ গুণ।

কিন্তু একই অপমান, একই প্রতারণা, একই অবহেলাকে বারবার ক্ষমা করতে করতে যদি নিজের আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলেন, তবে সেটি আর উদারতা নয়; সেটি আত্মঅবমূল্যায়ন।

ক্ষমা করুন, কিন্তু শিক্ষা নিন।

বিশ্বাস করুন, কিন্তু সতর্ক থাকুন।

ভালোবাসুন, কিন্তু নিজের মূল্য ভুলে নয়।

আমাদের সমাজে এখনো অনেকেই মনে করেন, সম্পর্ক ভেঙে গেলে জীবন শেষ।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

কিছু সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়াই কখনো কখনো নতুন জীবনের শুরু।

যে সম্পর্ক আপনাকে প্রতিদিন কষ্ট দেয়, আপনার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে, আপনার সম্ভাবনাকে থামিয়ে দেয়- সেখান থেকে বেরিয়ে আসাও অনেক সময় সাহসের পরিচয়।

সব সম্পর্ক ধরে রাখাই সফলতা নয়; কিছু সম্পর্ক থেকে সম্মানের সঙ্গে বেরিয়ে আসাও সফলতা।

আপনার একটি নাম আছে।

একটি পরিচয় আছে।

একটি পরিবার আছে।

একটি স্বপ্ন আছে।

একটি লক্ষ্য আছে।

এই পরিচয়গুলো যেন কোনো সম্পর্কের ভিড়ে হারিয়ে না যায়।

মানুষ আপনাকে শুধু কারও প্রিয়জন হিসেবে নয়, একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবেও চিনুক।

সবচেয়ে সুন্দর ভালোবাসা সেই ভালোবাসা-

* যেখানে সম্মান আছে।

* যেখানে সততা আছে।

* যেখানে বিশ্বাস আছে।

* যেখানে পারস্পরিক যত্ন আছে।

* যেখানে স্বাধীনতা আছে।

* যেখানে দুজন মানুষই নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায়।

এমন সম্পর্কেই মানুষ নিরাপত্তা অনুভব করে।

এমন সম্পর্কেই মানুষ মানসিকভাবে বেড়ে ওঠে।

এমন সম্পর্কেই ভালোবাসা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

কাউকে ভালোবাসা মানবজীবনের এক অপূর্ব অনুভূতি। কিন্তু সেই ভালোবাসা যদি আপনাকে নিজের কাছ থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়, তবে একটু থেমে ভাবার সময় এসেছে।

নিজেকে ভালোবাসা মানে অহংকার নয়।

নিজের যত্ন নেওয়া মানে স্বার্থপরতা নয়।

নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া মানে সম্পর্ককে অবহেলা করা নয়।

বরং এগুলোই একটি সুস্থ, সম্মানজনক এবং দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ভিত্তি।

মনে রাখবেন, যে মানুষ নিজের হৃদয়ের যত্ন নিতে জানে, সেই মানুষই অন্যের হৃদয়ও সত্যিকার অর্থে আগলে রাখতে পারে। তাই ভালোবাসুন- কিন্তু নিজের আলো নিভিয়ে নয়। কারও সুখের জন্য নিজেকে অন্ধকারে ঠেলে দেবেন না। কারণ আপনি নিজেও এই পৃথিবীতে সম্মান, যত্ন, ভালোবাসা এবং সুখ পাওয়ার সমান অধিকার নিয়ে এসেছেন।

আপনার অস্তিত্বের মূল্য কোনো সম্পর্কের চেয়ে কম নয়। আপনি নিজে ভালো থাকলে, আপনার ভালোবাসাও সুস্থ থাকবে। আর সুস্থ ভালোবাসাই মানুষকে ভাঙে না, বরং গড়ে তোলে।

ওমায়ের আহমেদ শাওন 

(লেখক, উদ্যোক্তা ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক)