‘উগ্র চিন্তাধারার’ জামায়াত প্রধান বিরোধী দল, দুঃখ নুরের
সূত্রঃ সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে ‘উগ্র চিন্তাধারার দল’ আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। তিনি বলেছেন, জামায়াত একটি আসনেও নারীকে মনোনয়ন দেয়নি এবং দলটি বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। এমন একটি দল জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল হওয়ায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর সিরডাপে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব: রাজনীতিতে নারী ও তরুণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল সংলাপে এসব কথা বলেন নুরুল হক নুর। গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এ সংলাপের আয়োজন করে।
নুরুল হক নুর বলেন, জামায়াতে ইসলামী একটি আসনেও নারী প্রার্থী দেয়নি। দলটি ক্ষমতায় গেলে পরিস্থিতি কী হতো, তা ভাবলেও তাঁর দুঃখ লাগে। তাঁর ভাষ্য, উগ্র চিন্তাধারার এবং বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না—এমন একটি দল এখন সংসদে প্রধান বিরোধী দলের অবস্থানে রয়েছে।
সংলাপে দেশের রাজনীতিতে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণের প্রতিবন্ধকতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা।
নুরুল হক নুর অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের গুণগত পরিবর্তনের জন্য সব তরুণকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু অল্প কয়েকজন তরুণকে ক্ষমতার অংশীদার করার মধ্য দিয়ে বৃহত্তর তরুণ সমাজকে বাইরে রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, কয়েকজন তরুণকে উপদেষ্টা করা হলেও এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের ডিসি অফিসে চাল-গম ভাগ করার মতো কাজে যুক্ত করা হয়েছে। তরুণেরা ক্ষমতার অংশ না হয়ে শক্তিশালী চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে ভূমিকা রাখলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।
নুরের দাবি, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তা গুটিকয়েক ব্যক্তি নষ্ট করেছেন। তাঁর মতে, তাঁরা জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, অতীতে স্বৈরশাসনের সময় ছাত্রনেতাদের বিভিন্ন সুবিধার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তাঁরা তা গ্রহণ করেননি। কিন্তু বর্তমান সময়ে কেউ কেউ প্রস্তাব দেওয়ার আগেই গাড়ি-বাড়ি ও অর্থের পেছনে ছুটেছেন এবং উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন।
পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষের অধিকার ও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে নুর বলেন, সেখানকার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে।
তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে নতুন দেশ ও কর্মক্ষেত্র খোঁজা, শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান এবং জাপানসহ বিভিন্ন দেশে ঋণসহায়তা সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে। পাশাপাশি সাইবার আইন সংস্কার এবং নারীদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর বক্তব্য ও উগ্র রাজনৈতিক আচরণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান তিনি।
সংলাপে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, তরুণদের ক্ষমতাকেন্দ্রিক করে তোলার পরিবর্তে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করা প্রয়োজন। নারীদের চরিত্রহনন ও বিদ্রূপের সংস্কৃতি বন্ধ করে তাঁদের মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে।
গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, তরুণদের রাজনীতিতে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের স্বার্থ রক্ষা। অতীতকে অস্বীকার না করে তরুণদের সামনে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রবীণদের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাতে হবে।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, সংসদে তরুণদের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব না থাকা রাজনৈতিক ব্যর্থতার পরিচয়। অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের সঙ্গে তরুণদের কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারে নারীদের প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি তাঁদের কার্যকর ক্ষমতা ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জি-৯-এর সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসাইন সায়ান্থ বলেন, ছাত্ররাজনীতির ঝুঁকি এবং অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাবে অনেক মেধাবী তরুণ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন স্তরে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।
সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, দীর্ঘ সময় দেশে নারী নেতৃত্বে সরকার থাকলেও জাতীয় রাজনীতিতে নারীদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়নি। রুয়ান্ডার মতো দেশে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় নারীর ক্ষমতায়ন ঘটলেও বাংলাদেশে সেই অগ্রগতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। একই সঙ্গে তরুণদের কর্মসংস্থানেও ঘাটতি রয়েছে।
ডাকসুর সদস্য হেমা চাকমা আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা, পরিচয়ের স্বীকৃতিতে বৈষম্য ও সীমিত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ দলগুলোর ভেতর থেকেই নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি নিরাপত্তার অজুহাতে নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত না করার কথাও বলেন।
সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এমকে/বিএম২৪









