ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা: প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা: প্রধানমন্ত্রী

সূত্রঃ সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক



ঢাকা, ১৮ আগস্ট ২০২৬: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।


মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে।


ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সাফল্য অনেকাংশেই এনবিআরের কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। জনগণ, বিশেষ করে করদাতারা এনবিআরকে একটি নির্ভরযোগ্য ও আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়।


তিনি বলেন, দক্ষ, স্বচ্ছ ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। বর্তমান সরকার এনবিআরসহ পুরো রাজস্ব কাঠামোকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। করদাতাদের প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব রাজস্ব কর্মকর্তাদেরই নিতে হবে।


দীর্ঘদিনের শাসন-শোষণের প্রভাব এনবিআরেও পড়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নীতি ও নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে কাউকে সুবিধা দেওয়া, কারও প্রতি বিরূপ আচরণ এবং রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এতে মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এখন ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।


বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রযুক্তির বিকাশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন এবং নতুন ব্যবসায়িক মডেলের কারণে রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এসব মোকাবিলায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে।


ডিজিটাল অর্থনীতি, ই-কমার্স, ট্রান্সফার প্রাইসিং, আন্তর্জাতিক করব্যবস্থা, বাণিজ্যিক আর্থিক অপরাধ, মানি লন্ডারিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ে কর্মকর্তাদের দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।


তিনি বলেন, দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত এখনো সক্ষমতার তুলনায় কম। অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো করব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। তাই সীমিতসংখ্যক নিয়মিত করদাতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে করদাতার পরিধি বাড়াতে হবে। এ জন্য করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা জরুরি।


প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক কর প্রশাসনের লক্ষ্য শুধু বেশি কর আদায় করা নয়; বরং মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করা। করব্যবস্থাকে সহজ, স্বচ্ছ, দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে, যাতে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে কর দিতে পারে।


একই করদাতার ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানো টেকসই পদ্ধতি নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, কর প্রদানের সক্ষমতা রয়েছে—এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করে নিয়ম অনুযায়ী করের আওতায় আনতে হবে। এ জন্য ডিজিটাল ও তথ্যভিত্তিক আধুনিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।


ভ্যাটকে আধুনিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ভ্যাট ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভ্যাট প্রশাসনের জটিলতার কারণে যেন ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।


তিনি আরও বলেন, কাস্টমস, ভ্যাট বা আয়কর আদায় শুধু কঠোরতার বিষয় নয়। রাজস্ব ব্যবস্থাপনার প্রতি করদাতাদের আস্থা তৈরি হলে রাজস্ব আহরণ সহজ হয়। তাই এনবিআরকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে, যাকে মানুষ ভয় না পেয়ে বিশ্বাস করবে।


রাজস্ব কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠান ও দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। জনগণের কাছে এনবিআরকে আরও বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।


তিনি বলেন, সরকার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়। প্রত্যেক মানুষের অবদানকে সম্মানের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হবে। দেশে সমস্যা রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও কিছু সমস্যা থাকবে। তবে আলোচনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেগুলোর সমাধান করা হবে।


সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা যেন নিরাপদ ও স্বস্তির সঙ্গে দেশ গঠনে কাজ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।


রাজস্ব আহরণে সাম্প্রতিক ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণের পরিমাণ ইতিবাচক ছিল। এটি প্রমাণ করে রাজস্ব কর্মকর্তারা সক্ষম। দেশপ্রেম ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করলে আরও ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।


সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বার্থে সবাইকে নিয়ে শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।


এর আগে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে রাজস্ব সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে রাজস্ব আহরণ নিয়ে মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে বক্তব্য দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।


অনুষ্ঠান শেষে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন স্টলে গিয়ে ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রদর্শিত নানা উপস্থাপনা ঘুরে দেখেন।



এমকে/বিএম২৪