দেশে বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা, কতটুকু প্রস্তুত আমরা?
সূত্রঃ সংগৃহীত
বিশেষ প্রতিবেদক
রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় আবারও মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। আজ সোমবার (১৭ আগস্ট) ভোর ৫টা ৩২ মিনিটে অনুভূত হওয়া এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৩। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর শিবপুরে। ঢাকার ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে উৎপত্তিস্থলটির দূরত্ব প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার।
মাত্রা কম হওয়ায় এ ভূমিকম্পে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে রাজধানীর কাছাকাছি এলাকায় বারবার ভূকম্পন অনুভূত হওয়ায় নতুন করে সামনে এসেছে পুরোনো প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি বড় ধরনের ভূমিকম্পের জন্য প্রস্তুত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে ভূমিকম্পের ঝুঁকিকে অবহেলা করারও সুযোগ নেই। কারণ, বাংলাদেশ এমন একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক চাপ ও নড়াচড়া ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি করছে।
ঢাকার আশপাশে কেন বারবার ভূমিকম্প?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার আশপাশের এলাকায় একাধিক ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। গত বছরের নভেম্বরেও নরসিংদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর আগে ও পরেও এ অঞ্চলে কয়েক দফা ভূকম্পন হয়েছে।
এ ছাড়া গত ২২ জুন রাতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। উৎপত্তিস্থলটি রাজধানীর আগারগাঁও থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবিরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, টেকটোনিক প্লেটের নিয়মিত নড়াচড়ার কারণেই এ অঞ্চলে ছোটখাটো ভূমিকম্প হচ্ছে। বাংলাদেশের উত্তরে হিমালয় অঞ্চলে ইউরেশীয় প্লেটের ওপর ভারতীয় প্লেটের চাপ রয়েছে। একই সঙ্গে তুলনামূলক ছোট বার্মা প্লেটও বাংলাদেশের ভূখণ্ডে চাপ তৈরি করছে। এসব ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে মাঝেমধ্যে ভূকম্পন অনুভূত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকাকে কেন্দ্র করে ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে বড় ভূমিকম্প সৃষ্টির মতো কোনো বড় সক্রিয় ফল্ট লাইনের সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। ঐতিহাসিকভাবেও এই এলাকায় বড় মাত্রার ভূমিকম্পের রেকর্ড তুলনামূলক কম। ফলে সাম্প্রতিক ছোট ভূমিকম্পগুলোকে সরাসরি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কিন্তু এখানেই ঝুঁকি শেষ নয়।
বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি কোথায়?
বাংলাদেশের জন্য বড় বিপদের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে দেশের সীমান্তবর্তী বা আশপাশের ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে বড় কোনো ভূমিকম্প হলে। বিশেষ করে সিলেটের কাছে ডাউকি ফল্ট, ভারতের আসামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল এবং দেশের অন্যান্য ফল্ট থেকে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে তার শক্তিশালী কম্পন ঢাকায় অনুভূত হতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারীর মতে, গত কয়েক বছরে ঢাকার আশপাশে বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প হলেও এগুলোকে কেন্দ্র করে এখনই বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।
তিনি মনে করেন, ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প যেকোনো সময় বাংলাদেশে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। অতীতে আসামের কাছাড়, বেঙ্গল অঞ্চল, শ্রীমঙ্গল ও ধুবড়িতে ৭ মাত্রার বেশি ভূমিকম্পের নজির রয়েছে। এসব ঐতিহাসিক ভূমিকম্প দেখিয়ে দেয়, এই অঞ্চলে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ঢাকার ভবন
ভূমিকম্পের ঝুঁকি শুধু ভূমিকম্পের মাত্রার ওপর নির্ভর করে না। একটি ভূমিকম্প কতটা প্রাণঘাতী হবে, তা নির্ভর করে ভবনের মান, জনঘনত্ব, উদ্ধারব্যবস্থা, রাস্তার অবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতির ওপর।
ঢাকার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন।
অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারীর বক্তব্য অনুযায়ী, জাইকা ও সিডিএমপির জরিপে ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ওই ধরনের ভূমিকম্পে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকায় প্রায় ২১ লাখ বাসযোগ্য স্থাপনার মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ ছোট ভবন বা টিনশেড স্থাপনা। বড় বিপদের জায়গা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বহুতল পাকা ভবনগুলো। অবশিষ্ট প্রায় ৬ লাখ বহুতল ভবনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভবন কাঠামোগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
এই বাস্তবতা ভয়াবহ। কারণ ভূমিকম্পের সময় ভবন ধসে পড়লে কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ আটকা পড়তে পারেন। সরু রাস্তা, অপরিকল্পিত পার্কিং, ঘনবসতি এবং জরুরি যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
ভূমিকম্প মানুষ মারে না, দুর্বল ভবন মারে
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের বহুল ব্যবহৃত একটি বক্তব্য হলো—‘ভূমিকম্প মানুষ মারে না, দুর্বল ভবনই মানুষকে মারে।’ কথাটি বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
ভূমিকম্পের সময় একটি ভবন যদি প্রকৌশলগতভাবে নিরাপদ থাকে, তাহলে শক্তিশালী কম্পনেও প্রাণহানি তুলনামূলকভাবে কমানো সম্ভব। বিপরীতে, নকশাগত ত্রুটি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী, নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণ এবং পুরোনো ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এ কারণে ভূমিকম্প প্রস্তুতির প্রধান লক্ষ্য শুধু ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানো কিংবা ধ্বংসস্তূপ সরানোর যন্ত্রপাতি কেনা হওয়া উচিত নয়। বরং নতুন ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প সহনশীল নকশা নিশ্চিত করা এবং পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী রেট্রোফিটিং বা কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী করা জরুরি।
প্রস্তুতি কতটুকু?
বাংলাদেশে ভূমিকম্প মোকাবিলায় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রস্তুতি রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স উদ্ধারকাজের জন্য প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সংগ্রহ করছে। বিভিন্ন সময় মহড়া, জনসচেতনতা কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণের আয়োজনও করা হয়।
তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—এ প্রস্তুতি কি বড় শহরে ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট?
ঢাকার বাস্তবতা বলছে, এখনো অনেক কাজ বাকি। ভবনের নিরাপত্তা যাচাই, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা, পুরোনো স্থাপনা সংস্কার, জরুরি সেবা নিশ্চিত করা, হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রশস্ত উদ্ধারপথ সংরক্ষণ এবং সাধারণ মানুষকে ভূমিকম্পের সময় করণীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করা—সব ক্ষেত্রেই আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষ করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন এবং নির্মাণকাজে নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে তদারক করা জরুরি। শুধু কাগজে-কলমে নকশা অনুমোদন নয়, নির্মাণের প্রতিটি পর্যায়ে প্রকৌশলগত মান নিশ্চিত করতে হবে।
আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতি দরকার
সোমবারের ৩ মাত্রার ভূমিকম্পকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক ছড়ানোর কোনো কারণ নেই। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যও বলছে, ঢাকার আশপাশে সাম্প্রতিক ছোট ভূমিকম্পগুলোকে বড় ভূমিকম্পের নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে এসব ভূমিকম্পকে সতর্কবার্তা হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। কারণ বড় ভূমিকম্প কখন হবে, তা নির্ভুলভাবে আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। তাই ভূমিকম্পের পূর্বাভাসের অপেক্ষায় না থেকে ঝুঁকি কমানোর প্রস্তুতি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সরকারের দায়িত্ব হবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত ও সংস্কার করা, নির্মাণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এবং উদ্ধার ও চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো। আর নাগরিকদেরও জানতে হবে—ভূমিকম্পের সময় কীভাবে নিরাপদ থাকতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে এবং কম্পন থামার পর কীভাবে নিরাপদে ভবন থেকে বের হতে হবে।
ভূমিকম্প থামানো মানুষের হাতে নেই। কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এখন প্রশ্ন হলো—বড় দুর্যোগ আঘাত হানার পর আমরা প্রস্তুতি নেব, নাকি তার আগেই নিজেদের নিরাপদ করব?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ স্পষ্ট—আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতিই হতে পারে প্রাণ বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।









