গণতন্ত্রের মিছিলে আত্মদান: শহীদ নূর হোসেন দিবস আজ

প্রকাশিত: ১০ নভেম্বর ২০২৫, ০১:৩১ পিএম
গণতন্ত্রের মিছিলে আত্মদান: শহীদ নূর হোসেন দিবস আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: 

আজ ১০ নভেম্বর শহীদ নূর হোসেন দিবস। স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের এক ঐতিহাসিক দিনকে সামনে রেখে সারা দেশে গভীর শ্রদ্ধা ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হচ্ছে গণতন্ত্রের বরেণ্য শহীদ নূর হোসেনকে। ১৯৮৭ সালের এই দিনে তৎকালীন সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের দাবিতে রাজপথে জীবন দেন তিনি।

বুকে লেখা “স্বৈরাচার নিপাত যাক” এবং পিঠে “গণতন্ত্র মুক্তি পাক”—এই দুই স্লোগান শুধু একটি আন্দোলনের ভাষাই নয়, হয়ে ওঠে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদের অগ্নিপ্রতীক। আজও সেই দিনটি স্বাধীন বাংলাদেশের গণতন্ত্রচর্চার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।

জিরো পয়েন্টে প্রাণ উৎসর্গ, বেগবান হয় গণআন্দোলন:

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর রাজধানীর পল্টনের জিরো পয়েন্ট এলাকায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের মিছিল অতিক্রমের সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ও গুলি ছোড়ে। মিছিল ছত্রভঙ্গ হওয়ার একপর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তরুণ নূর হোসেন। একই ঘটনায় শহীদ হন যুবলীগ নেতা বাবুলও।

জনতার ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। নূর হোসেনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এক নতুন গতি পায়। সর্বস্তরের জনগণ রাস্তায় নেমে আসে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। তাঁর মৃত্যু যেন অন্ধকারে জাতির কাছে আশা জাগানোর শিখা হয়ে দাঁড়ায়....

স্বৈরাচারের পতন ত্বরান্বিত করে তাঁর আত্মদান:

নূর হোসেন শহীদ হওয়ার পর মাত্র এক মাসের মাথায়, ১৯৮৭ সালের ৬ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন এরশাদ। ১৯৮৮ সালের মার্চে নির্বাচন হলেও বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অনুপস্থিতিতে তা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

পরবর্তীতে দীর্ঘ গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগে বাধ্য হন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে দেশে পুনর্স্থাপিত হয় গণতন্ত্র। নূর হোসেনের আত্মদান এ আন্দোলনকে সাফল্যের দিগন্তে পৌঁছে দেয়....

নারিন্দার এক সাধারণ তরুণ থেকে জাতির অনুপ্রেরণা:

ঢাকার নারিন্দায় জন্ম নেওয়া নূর হোসেন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে অটোরিকশা চালক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন। জীবনের সংগ্রামে ব্যস্ত তরুণের মনে গণতন্ত্রের স্বপ্ন ছিল প্রবল। তাই তিনি বুকে ও পিঠে মুক্তিকামী স্লোগান লিখে মিছিলে দাঁড়ান—শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে যা পরিণত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীকে।

স্মরণে কর্মসূচি, শ্রদ্ধায় ভাসছে শহীদ নূর হোসেন চত্বর:

দিবসটি উপলক্ষে আজ সকাল থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, শ্রমিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শহীদ নূর হোসেন চত্বরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল এবং মানববন্ধন।

রাজধানীর জিরো পয়েন্ট—যেখানে নূর হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন—পরবর্তীতে তাঁর নামেই শহীদ নূর হোসেন চত্বর নামে পরিচিত হয়েছে।

গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূলে থাকা এই চত্বর আজও সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

দেশের গণতন্ত্রচর্চায় অম্লান তাঁর অবদান:

শহীদ নূর হোসেন শুধু একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী নন; তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের অগ্রদূত। তাঁর রক্তে রঞ্জিত স্লোগান আজও স্বৈরাচারবিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে নতুন শক্তি ও সাহস যোগায়।