কালাইয়ে জ্বিন দিয়ে অপারেশন, ধর্ম-বিশ্বাসের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা প্রতারণার ভয়ঙ্কর ফাঁদ

প্রকাশিত: ০২ অক্টোবর ২০২৫, ০২:১৫ পিএম
কালাইয়ে জ্বিন দিয়ে অপারেশন, ধর্ম-বিশ্বাসের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা প্রতারণার ভয়ঙ্কর ফাঁদ

সউদ আব্দুল্লাহ, কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি:

জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলায় গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ প্রতারণার চিত্র, যার শিকার হচ্ছে গ্রামের সহজ-সরল, শিক্ষাবঞ্চিত মানুষ। “জ্বিনের মাধ্যমে চিকিৎসা” দেওয়ার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেণির প্রতারক। ধর্মীয় আবরণে নিজেদের “জ্বিন”, “পীর” ইত্যাদি পরিচয়ে দাবি করে তারা মানুষের ভয়,অসুস্থতা ও সংকটকে মূলধন বানিয়ে রীতিমতো গড়ে তুলেছে লক্ষ লক্ষ টাকার রমরমা ব্যবসা।

কালাই উপজেলার পুনট ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামে জাহেরা বিবি(বানেছা পরী) নামের এক নারী দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে চিকিৎসার নামে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। দাবি করেন, তার মাধ্যমে জ্বিন রোগ নির্ণয় করে, চিকিৎসা দেয় এবং ভবিষ্যৎও বলে দেয়। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বানেছা পরীর বাবা আবুল হোসেন এবং বোনের স্বামী জাহিদুল ইসলাম মিলে গড়ে তুলেছেন “জ্বিন চিকিৎসালয়।এখানে রোগী দেখা হয় সপ্তাহে চার দিন। সিরিয়ালের জন্য দিতে হয় ৩০ টাকা। এরপর শুরু হয় তেল পড়া,পানি পড়া,ঝাঁড়ফুঁক এবং আঙুল দিয়ে ‘ইনজেকশন’ দেওয়ার মতো হাস্যকর অপচিকিৎসা।তার বাড়ির আঙিনায় শত শত রোগীর ভিড়।কেউ এসেছেন ক্যানসার,কেউ টিউমার,কেউ আবার সন্তানহীনতা বা মানসিক রোগের চিকিৎসা নিতে। এরপর শুরু হয় তথাকথিত জ্বিন চিকিৎসা একেকজন রোগীর “ভবিষ্যৎ” জানানো হয়,বেশিরভাগ সময়েই বলা হয় রোগী ‘শেষ পর্যায়ে’, ‘জিনের খপ্পরে’ কিংবা ‘আর বাঁচবে না’। এরপর আর্থিক লেনদেন শুরু হয়। দর কষাকষি করে দাবি করা হয় ৫ হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত। যার অবস্থা যত করুণ,তার কাছ থেকে দাবি তত বেশি।অথচ বাংলা বা আরবি কোনো ভাষায় ধর্মীয় কিংবা চিকিৎসাগত কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই তার।

খবর সংগ্রহ করতে গেলে বাবা আবুল হোসেন ও তার বোনের স্বামী জাহিদুল ইসলামসহ লোকজন স্থানীয় সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়। দেখাতে চায় চিকিৎসার একটি লাইসেন্স। যখন প্রশ্ন করা হয়, কীভাবে চিকিৎসা করেন,তখন তারা উত্তরে স্পষ্ট জানান,তাদের টাকার দরকার, পারলে তাদের ব্যবসা বন্ধ করেন। জানা গেছে, তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসনও অবহিত থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং জাহেরা বিবি নিজেই দাবী করেন, প্রশাসনের লোকজন নিয়মিত তার সাথে যোগাযোগ রাখে।

সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, এই কথিত চিকিৎসার মাধ্যমে “জ্বিন দিয়ে অপারেশন” পর্যন্ত করা হয় বলে দাবি করা হয়। এতে রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা হয় হাজার হাজার টাকা। চিকিৎসা নিতে আসা কোরবান আলী নামে একজন রোগী বলেন, লোকমুখে শুনে এসেছি, দেখি কী হয়। জহুরা বেগম জানান, তার হাত ভাঙ্গা, হাসপাতালে না গিয়ে এসেছেন এখানে “জ্বিন” দিয়ে সাড়াতে।

এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম রসুল ও মাহতাব আলী প্রামাণিক স্পষ্ট ভাষায় জানান,এটা   ইসলামবিরোধী,অমানবিক এবং আইনবিরোধী।তারা বহুবার এই ধরনের প্রতারণা বন্ধের জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কিন্তু বারবার প্রতিবাদ সত্ত্বেও প্রতারকচক্র তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে দম্ভভরে। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেলে কখনও অর্থের প্রলোভন, কখনও হুমকি দিয়ে তাদের বাধা দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার মাহফুজ আলম বলেন,এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও প্রতারণামূলক। চিকিৎসা দেওয়ার অধিকার কেবলমাত্র রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকদের রয়েছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়ানক হুমকি এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করে স্থায়ী ক্ষতির মুখে ফেলছে।

এ বিষয়ে কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন বলেন, আমি এখানে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জ্বীন দিয়ে অপারেশনের বিষয়ে এ-ই প্রথম আমাদের মাধ্যমে জানলাম। এটি অবশ্যই ফৌজদারি অপরাধ। দ্রুত খোঁজখবর নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামিমা আক্তার জাহান জানান,এমন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড 

বন্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। তিনি এলাকাবাসীকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, কোনো অবস্থাতেই অন্ধ বিশ্বাসের ফাঁদে পড়ে জীবন নিয়ে খেলা করা যাবে না