২০১৮ নির্বাচনে ‘ভোট প্রকল্প’: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বৈঠক থেকে পুলিশের গোপন অ্যানালাইসিস সেল—উন্মোচিত চাঞ্চল্যকর নীলনকশা

প্রকাশিত: ১৬ নভেম্বর ২০২৫, ০৪:১১ পিএম
২০১৮ নির্বাচনে ‘ভোট প্রকল্প’: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বৈঠক থেকে পুলিশের গোপন অ্যানালাইসিস সেল—উন্মোচিত চাঞ্চল্যকর নীলনকশা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

২০১৮ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গোপন পরিকল্পনা, শক্তি প্রদর্শন এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনের রূপরেখা নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনার নতুন তথ্য সামনে এসেছে। এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উপস্থিত ছিলেন সেনাপ্রধান, সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান, স্বরাষ্ট্র সচিব, নির্বাচন কমিশনের সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব।

আইজিপির ‘২৯০ আসনের ফল পরিবর্তনের’ প্রস্তাব

বৈঠকে বিভিন্ন বাহিনী নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরলেও সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রস্তাবটি দেন তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারী। বৈঠকে তিনি সরাসরি বলেন—

> “আমি নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তন করে দিতে পারব। আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের কমপক্ষে ২৯০ আসনে বিজয়ী করা সম্ভব।”

জাবেদ পাটোয়ারী আরও জানান, মাঠপর্যায়ে সর্বাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকে এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হওয়ায় নির্বাচনকে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশেষ করে সব ভোটকেন্দ্রে পুলিশের উপস্থিতির সুযোগকে তিনি ‘মূল সুবিধা’ হিসেবে তুলে ধরেন।

একজন উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তা, চাকরি হারানোর আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করে, জানান—আইজিপি ওই বৈঠকে নির্বাচনী প্রভাব বিস্তারের ‘পুরো অপারেশন’-এর দায়িত্ব কার্যত নিজের কাঁধে তুলে নেন।

‘কপোতাক্ষ কক্ষ’: পুলিশ সদর দপ্তরের গোপন অ্যানালাইসিস সেলের নীলনকশা:

পুলিশ সদর দপ্তরের নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলার ‘কপোতাক্ষ’ নামের কক্ষটিকে ২০১৮ সালের অক্টোবরে রূপান্তর করা হয় দেশের সবচেয়ে পরিকল্পিত নির্বাচনী অপারেশনের কেন্দ্রবিন্দুতে। সাধারণ অফিসরুম হলেও সেখানে সাজানো হয় কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, স্ক্যানার ও প্রজেক্টর—যা পরে ব্যবহৃত হয় একটি বিশেষায়িত বিশ্লেষণ সেলের জন্য।

এই সেলের উদ্দেশ্য ছিল—

১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের সব কেন্দ্রের ভোটের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ...

কোন কেন্দ্রে কত ভোট ‘কাস্ট’ করতে হবে তার হিসাব তৈরি,

প্রতিটি আসনে ভোটের প্রবণতা পর্যালোচনার মাধ্যমে ‘রাতের ভোট’-খ্যাত ২০১৮ নির্বাচনের পূর্ণ প্রোগ্রাম তৈরি।

এএসপি থেকে ডিআইজি পদমর্যাদার ৫৪ জন কর্মকর্তা আগস্ট থেকে ডিসেম্বর—চার মাস ধরে এই কক্ষে বসে নীলনকশা তৈরি করেন। তদন্তে যুক্ত এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, এই ৫৪ জনই সরাসরি ভোট নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এসবি রিপোর্টই ছিল ভোট ডাকাতির ‘মূল প্রেরণা’:

এর আগে ২০১৮ সালের অক্টোবরে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) একটি গোপন প্রতিবেদনে উঠে আসে উদ্বেগজনক পূর্বাভাস। এসবি’র তৎকালীন ডিআইজি (পলিটিক্যাল) মাহবুব হোসেনের নেতৃত্বে প্রস্তুত করা রিপোর্টে বলা হয়—

> “নিজস্ব শক্তিতে নির্বাচন করলে আওয়ামী লীগ মাত্র ১৪টি আসন পেতে পারে।”

এই রিপোর্টই পরবর্তীতে পুরো ভোট প্রকল্পের ভিত্তি হয়ে ওঠে বলে তদন্ত সূত্রে জানা যায়।

পুলিশ সদর দপ্তরে স্থাপন করা হয় ‘কন্ট্রোল রুম’:

এসবি রিপোর্টের পরপরই পুলিশ সদর দপ্তরে গঠন করা হয় একটি বিশেষ মনিটরিং সেল বা কন্ট্রোল রুম। এ টিমে ছিলেন—

ঢাকা সিটি এসবির ডিআইজি মোহাম্মাদ আলী মিয়া,

এজেডএম নাফিউল ইসলাম,

ঢাকা রেঞ্জের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (পলিটিক্যাল),

বিশেষ পুলিশ সুপার (পলিটিক্যাল),

এসবির বিশেষ পুলিশ সুপার (গোপনীয়),

পলিটিক্যাল শাখার সব অতিরিক্ত এসপি এবং এএসপি।

এই কন্ট্রোল রুমের কাজ ছিল ভোটের আগের সপ্তাহ থেকে নির্বাচন-পরবর্তী সময় পর্যন্ত পুরো পরিস্থিতির ‘রিয়েল-টাইম’ প্ল্যানিং ও অপারেশন তদারকি করা।

‘টিম জাবেদ’: আইজিপির গোপন বিশ্বস্ত চক্র:

তদন্ত সূত্রগুলো জানায়, জাবেদ পাটোয়ারীর একটি বিশেষ বিশ্বস্ত চক্র ছিল, যারা নিয়মিত গোপন অপারেশন পরিচালনা করতেন। ‘টিম জাবেদ’ নামে পরিচিত এই মূল টিমে ছিলেন—

ডিআইজি (পলিটিক্যাল) মাহবুব হোসেন

সিটিটিসির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিআইজি) মনিরুল ইসলাম

এসবির বিশেষ পুলিশ সুপার (গোপনীয়) মিজানুর রহমান

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (এলআইসি) এএফএম আনজুমান কালাম

এআইজি (অ্যাডমিন) মিলন মাহমুদ

এআইজি (আরঅ্যান্ডসিপি-১) মোহাম্মাদ মাহফুজুর রহমান আল-মামুন

আইজিপির স্টাফ অফিসার মাসুদ আলম

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুনসুর আলম কাদেরী

কাজী মো. সালাহউদ্দিন

এদের সমন্বয়ে তৈরি করা হয় দেশের নির্বাচনী ইতিহাসের সবচেয়ে সুসংগঠিত ও প্রযুক্তি-নির্ভর ভোট নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা।

‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বৈঠক থেকে শুরু করে পুলিশের কপোতাক্ষ কক্ষে তৈরি গোপন অ্যানালাইসিস সেল—নতুন এই তথ্যগুলো নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়ার জটিলতা, গোপন পরিকল্পনা এবং ক্ষমতার বলয় কিভাবে কাজ করেছে তার আরও স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।