রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অদৃশ্য: গভীর নলকূপ স্থাপন বন্ধ
ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী প্রতিনিধি:
রাজশাহীর তানোরসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের একাধিক ইউনিয়নে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভয়াবহভাবে নিচে নেমে গেছে। কিছু এলাকায় একেবারেই পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি এতটাই মারাত্মক হয়েছে যে, বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) নতুন কোনো গভীর নলকূপ বসানো বন্ধ ঘোষণা করেছে। এতে স্থানীয় মানুষজনকে খাবার পানি সংগ্রহের জন্য এখন প্রায় এক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত যেতে হচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ি বাড়ি বসানো সাবমার্সিবল পাম্প থেকে জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে, যা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
সম্প্রতি পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য। গত জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ৫০টি জায়গায় দেড় হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত বোরিং করা হয়। জরিপে দেখা যায়, এসব এলাকার বেশ কয়েকটি স্থানে পানি ধারক স্তর বা অ্যাকুইফার একেবারেই অনুপস্থিত। সাধারণত ১৫০ থেকে ২০০ ফুটের মধ্যে অ্যাকুইফার পাওয়া যায়, কিন্তু তানোর উপজেলার পাচন্দর ইউনিয়ন ও মন্ডুমালা পৌর এলাকা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, নওগাঁর পোরশার ছাওড়া ইউনিয়ন ও সাপাহার উপজেলার সদর ইউনিয়নে তা অনুপস্থিত। আশপাশে ছোট ছোট পকেট অ্যাকুইফার থাকলেও সেগুলোও যেকোনো সময় ফুরিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই পরিস্থিতিতে ওয়ারপো বরেন্দ্র অঞ্চলের এসব ইউনিয়নকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পানি নীতি অনুযায়ী এসব এলাকায় পানির ব্যবহার করতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এবং প্রথম অগ্রাধিকার দিতে হবে খাবার পানিকে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক কৃষক বাড়ি বাড়ি বসানো সাবমার্সিবল পাম্প থেকে খাওয়ার পানি তোলার পাশাপাশি ধানখেতেও পানি দিচ্ছেন।
বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কাসেম বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠানকে অনেকেই শুধু ভূগর্ভস্থ পানি তোলা প্রতিষ্ঠান হিসেবে জানে। বাস্তবে ২০১২ সালের জুন থেকে আমরা নতুন কোনো গভীর নলকূপ বসানো বন্ধ করেছি। কৃষকদের কম পানিতে চাষ করা যায় এমন ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করার কাজ করছি।” তবে তিনি স্বীকার করেন, গ্রামীণ বিদ্যুতের সংযোগ নিয়ে কৃষকেরা বাড়ি বাড়ি সাবমার্সিবল পাম্প বসিয়ে ধানখেতে পানি দিচ্ছেন, যা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৮৫-৮৬ সাল থেকে বিএমডিএর মাধ্যমে অতিরিক্ত গভীর নলকূপ বসিয়ে সেচকাজ চালানো ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামার অন্যতম কারণ। এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। তাঁদের প্রস্তাব, গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর ও বিল পুনঃখনন এবং পানি-সাশ্রয়ী ফসল চাষকে উৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাবমার্সিবল পাম্পের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে আইনগতভাবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পানি সংকট এখন তাদের নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। অনেক পরিবারকে প্রতিদিন কয়েকবার দূর থেকে পানি বহন করতে হচ্ছে। কেউ কেউ পানির অভাবে চাষাবাদ কমিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।









