কথিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা'র চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসানের রিমান্ড মঞ্জুর

প্রকাশিত: ২৫ মে ২০২৬, ১২:৫২ এএম
কথিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা'র চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসানের রিমান্ড মঞ্জুর

মোঃ আসাদুজ্জামান,  বিশেষ প্রতিনিধি :

"আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা" এবং "Centre For Enforcement of Human Rights and Legal Aid (CEHRLA)"র কথিত চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদুল হাসানের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে বিজ্ঞ আদালত। রবিবার (২৪ মে) বিকেলে ঝিনাইদহের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সদর আমলি আদালতের বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সব্যসাচী রায় এই রায় প্রদান করেন।

জানা যায়, কাজী মাহমুদুল হাসান (৪২) নড়াইল সদরের উপশহর চরপাড়া রাস্তার কাজী আব্দুল মতিনের ছেলে। তার মায়ের নাম ফরিদা বেগম এবং স্ত্রী'র নাম রুমানা ইসলাম। তার এনআইডি নম্বর-১৯৪৩০৮০২৩২। 

কাজী মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের আমলে অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা, মানবাধিকার সংস্থার নাম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা, জনগণের অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগ বাণিজ্য, মানবপাচার, ভুয়া পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার, প্রশাসনের আদলে কার্যক্রম পরিচালনা, গোয়েন্দা সংস্থা'র নাম ব্যবহার করে ডিবি, র‍্যাব ও প্রশাসনিক টিমের মতো বিভিন্ন অপারেশন পরিচালনা ও সারাদেশব্যাপী ভয়ংকর অপরাধ নেটওয়ার্ক তৈরি সহ সরকার ও রাষ্ট্র বিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। 

জানা যায়, বুধবার (২০ মে) ঝিনাইদহের তারেক মোড়ে গোপন বৈঠক চলাকালে তাকে আটক করে স্থানীয় জনগণ। সেসময় তার সাথে ছিলেন ভোলা জেলার আমজাদ হোসেন (৩৮) ও প্রাইভেটকার ড্রাইভার। তারা ফিলন ফিড কোম্পানি'র পরিচয় প্রদান করেন। পরে তাদেরকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। সেসময় তাদের কাছ থেকে চারটি লাইসেন্সবিহীন ওয়াকিটকি, একাধিক পরিচয়পত্র ও একটি প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়েছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র। পরবর্তীতে, ঝিনাইদহ সদর থানা পুলিশ কাজী মাহমুদুল হাসানের সাথে থাকা অন্যান্যদের বেকসুর খালাস প্রদান করে, তাকে আদালতে প্রেরণ করে।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দাবি, বর্তমান সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা, সংস্থার নামে সদস্য কার্ড বিক্রি, ভুয়া কমিটি গঠন এবং প্রশাসনিক পরিচয় অপব্যবহারের উদ্দেশ্যে তিনি ঢাকা থেকে এসে ঝিনাইদহে অবস্থান করছিলেন। সেসময়, সন্দেহজনক কার্যক্রমের অভিযোগে জনতা তাদেরকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আসাদুজ্জামান জানান, আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে সংস্থা'র পরিচয়পত্র, লাইসেন্সবিহীন ওয়াকিটকি এবং একটি প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে CEHRLA-এর নাম, সরকারি নিবন্ধন নম্বর, লোগো, ব্যানার, পরিচয়পত্র ও নথিপত্র ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। অভিযোগে যাদের নাম উঠে এসেছে তারা হলেন- কাজী মাহমুদুল হাসান, মোঃ মইনুর রশীদ ও মোঃ সোলয়মান হাওলাদার।

অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের অমিত তালুকদার ও মাহমুদুল হাসান, ঝিনাইদহের মোঃ জুসেল এবং কক্সবাজারের মাহবুবুল আলম সবুজ। তাদের কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ, আবার কেউ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে জানা গেছে।

তাদের দাবি, বিভিন্ন জেলায় অভিযোগ দেয়ার পরও কার্যকর প্রতিকার মেলেনি। বরং, অভিযোগ তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি ও চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।

সংস্থাটির প্রকৃত প্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দেশের অন্তত ৩৪টি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ ও তথ্যপ্রমাণ জমা দেয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, 

তারা “এন্টি করাপশন টিম (ACT)”, “ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম (CIT)” এবং “ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম (ERT)”র নাম ব্যবহার করে নিজেদের প্রশাসনের অংশ হিসেবে পরিচয় দিতেন। এমনকি, তারা প্রশাসনের আদলে পোশাক ব্যবহার ও ওয়াকিটকি বহনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে আসছিলেন।

এদিকে, কাজী মাহমুদুল হাসানের বিভিন্ন বক্তব্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এক অনুষ্ঠানে তিনি নিজেকে জাতিসংঘের “ক্রাইম শাখার সদস্য” বলেও দাবি করেছেন।

অপর এক বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, তাদের সংগঠনটি ২০০২ সালের ২৬ মার্চ ৭ জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে এবং বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজারের বেশি। যদিও, সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সংগঠনটি মূলত ১৯৯৮ সালে নিবন্ধিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, মানবাধিকার সংগঠনের নাম ব্যবহার করে রাষ্ট্র ও সরকার বিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা, সাধারণ মানুষের অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া পরিচয়পত্র বিতরণ, প্রশাসনিক কাঠামোর অনুকরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং এটি অবশ্যই কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেজন্য প্রয়োজন গভীর তদন্ত।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, কাজী মাহমুদুল হাসান বিগত সরকারের আমলে ছিলেন আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী। জাতীয় পোশাক শ্রমিক লীগ থেকে শুরু করে যুবলীগ সকল ক্ষেত্রে ছিল তার অবাধ পদচারণা। আওয়ামী লীগের আমলে তিনি ক্ষমতা'র সর্বোচ্চ অপব্যবহার করেছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। 

এখন জনমনে একটি প্রশ্ন, সারাদেশব্যাপী ভয়াবহ অপরাধ নেটওয়ার্ক তৈরি করে কাজী মাহমুদুল হাসান আওয়ামী লীগের পক্ষে সরকার পতনের নীল নকশা আঁকছেন না তো? দেশজুড়ে কাজী মাহমুদুল হাসানের এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনার পৃষ্ঠপোষক তবে কি আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড?