বড়তারা ইউনিয়নে ভিজিডি তালিকায় প্যানেল চেয়ারম্যানের স্ত্রী-আত্মীয়দের নাম অন্তর্ভুক্তি, বঞ্চিত গরিবরা

প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর ২০২৫, ০৪:৪০ পিএম
বড়তারা ইউনিয়নে ভিজিডি তালিকায় প্যানেল চেয়ারম্যানের স্ত্রী-আত্মীয়দের নাম অন্তর্ভুক্তি, বঞ্চিত গরিবরা

সউদ আব্দুল্লাহ, কালাই(জয়পুরহাট) প্রতিনিধি:

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার বড়তারা ইউনিয়নে গরিব ও অসহায় নারীদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারের ভিজিডি (ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট) কর্মসূচির তালিকায় সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর প্যানেল চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম তার স্ত্রী,ভাগনী,চাচি,মামি,খালা ও অন্যান্য ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নাম তালিকাভুক্ত করেছেন। শুধু তাই নয়,এই সুবিধা দেওয়ার নাম করে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে মোটা অঙ্কের অর্থ।

স্থানীয়রা জানান, তালিকাভুক্তির জন্য প্রতিজন সুবিধাভোগীর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা। চূড়ান্ত তালিকা তৈরির পর আরও ১০০ টাকা করে আদায় করা হয় প্রতিটি নামের বিপরীতে। ফলে প্রায় ৪৪০ জনের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার টাকা। এই অর্থ প্যানেল চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, শফিকুল ইসলাম বড়তারা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য এবং বর্তমানে পরিষদের ৩ নম্বর প্যানেল চেয়ারম্যান।তার নিজ ওয়ার্ড থেকেই ৫৩ জনের নাম ভিজিডি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন,তার স্ত্রী,ভাইয়ের দুই স্ত্রী, মামি,চাচি,

খালা, ভাগনীসহ একাধিক আত্মীয়- স্বজন। এদের অনেকের রয়েছে ৬-৮ বিঘা ফসলি জমি,পাকা বাড়ি,পুকুর ও অন্যান্য সম্পদ। অথচ প্রকৃত দরিদ্র নারীরা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

তালিকার ২১২ নম্বরে রয়েছে মাফুজা খাতুন, ২৩০ নম্বরে সেলিনা খাতুন,যারা শফিকুলের ভাইয়ের স্ত্রী। ২১০ নম্বরে খোতেজা খাতুন (মামি), ২১৪ থেকে ২১৭ পর্যন্ত রয়েছে রিমা বেগম, আলেয়া বেগম, আমেনা বেগম,যারা তার চাচি। ১৮২ নম্বরে রয়েছে খালা শেফালী বেগম এবং ১৯১ নম্বরে ভাবী রাজিয়া সুলতানা। এমনকি তালিকায় একজন চিকিৎসক ভাগনীর নামও রাখা হয়েছিল বলে নিশ্চিত করেছেন উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা।

স্থানীয় বাসিন্দা মহসিন আলী বলেন,শফিকুল একজন দুর্নীতিবাজ লোক। তিনি আওয়ামী লীগের লোক হয়ে এই সময়ে কিভাবে গরিবের হক মেরে খাচ্ছে! টাকা ছাড়া কোনো কাজ করে না। এমনকি ওয়ারিশান সার্টিফিকেটের জন্যও টাকা নেয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক সুবিধাভোগী বলেন, আমি গরিব মানুষ, অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হয়। ভিজিডির কার্ড দেওয়ার জন্য শফিকুল আমার কাছ থেকে তিন হাজার টাকা নিয়েছে। আল্লাহ ওর বিচার করবেন।

বড়তারা গ্রামের জাহিদুল ইসলাম বলেন, চাল বিতরণের সময় এক লাইনে শুধু শফিকুলের আত্মীয়- স্বজনদেরই দেখা যায়। গরিবের হক চলে যাচ্ছে ধনীদের ঘরে। এমনকি তার বড় ভাই প্রকাশ্যে কম দামে চাল কিনে নেয়।কেউ বাধা দিলে পরিষদের ভেতরেই ঝগড়া হয়। চেয়ারম্যান এসব নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেননি।

তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় জানায়, ভিজিডি কর্মসূচির জন্য চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ১,০২৭টি অনলাইন আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ৪৪০ জনের নাম চূড়ান্ত করা হয়। এই কাজটি করা হয় ৩০ জুন, ইউপি চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে ট্যাগ অফিসার, ইউপি সদস্য ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে। তবে পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়,কিছু অযোগ্য ও আত্মীয়প্রীতিনির্ভর নাম তালিকায় স্থান পেয়েছে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে প্যানেল চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন,তালিকা তৈরি করেছে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। আমার কোনো হাত নেই। আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তবে মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা লায়লা নাসরিন জাহান জানান, তদন্তে প্রমাণ মিলেছে যে, শফিকুল ইসলাম মিথ্যা তথ্য দিয়ে তার স্ত্রী ও ভাগনীর নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। অভিযোগের পর তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। আত্মীয়দের আরও নাম থাকলে, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগ সম্পর্কে বড়তারা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন,তালিকা তৈরি করেছে ট্যাগ অফিসাররা, আমরা শুধু সহযোগিতা করেছি। আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ভিত্তিহীন।একজন জনপ্রতিনিধির দরিদ্র আত্মীয় থাকতেই পারে,তাই বলে তারা কি সরকারি সুবিধা পাবে না? তবে তালিকায় শফিকুলের ভাগনীর নাম ছিল,স্ত্রীর নাম ছিল না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, নীতিমালা অনুযায়ীই তালিকা তৈরি হয়েছে। কেউ যদি ভুল বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে আত্মীয়দের নাম অন্তর্ভুক্ত করে থাকে, তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টাকা নেওয়ার বিষয়ে এখনো লিখিত কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি।অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।