নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানি: ৩৪ বছর বয়সী প্রগতিশীল নেতার ঐতিহাসিক জয়

প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর ২০২৫, ০২:৪৩ পিএম
নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানি: ৩৪ বছর বয়সী প্রগতিশীল নেতার ঐতিহাসিক জয়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

নিউইয়র্কের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট প্রার্থী জোহরান মামদানি জয় পেয়েছেন শহরের ১১১তম মেয়র হিসেবে। এনবিসি নিউজের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রগতিশীল ভোটারদের উচ্ছ্বসিত সমর্থনে এবং দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে মামদানি এই ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেছেন।

তার জয়ে যেমন আনন্দে ভাসছে প্রগতিশীল শিবির, তেমনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রিপাবলিকান নেতারা এবং কিছু মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাটও।

কুয়োমো ও স্লিওয়াকে পরাজিত করে মেয়র জোহরান:

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী মামদানি সহজ ব্যবধানে পরাজিত করেন সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো এবং রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়াকে।

কুয়োমো ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে পরাজয়ের পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়েছিলেন।

বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামস গত সেপ্টেম্বরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়ে কুয়োমোকে সমর্থন জানান, তবে সেটিও মামদানির গতিপথ থামাতে পারেনি।

মাত্র এক বছরে অখ্যাত রাজনীতিক থেকে নিউইয়র্কের নেতৃত্বে:

প্রায় এক বছর আগে রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছিলেন মামদানি।

একজন তুলনামূলক অখ্যাত স্টেট অ্যাসেম্বলিম্যান থেকে তিনি আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহরের নেতৃত্বে পৌঁছে গেছেন—যা অনেকেই “অভূতপূর্ব উত্থান” বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে তিনি নিউইয়র্কের প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরিকে দু’বার পরাজিত করেছেন।

প্রগতিশীল এজেন্ডা: ভাড়া স্থগিত, বিনামূল্যে বাস, সিটি মুদি দোকান

মামদানি নির্বাচনী প্রচারণায় জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটকে প্রধান ইস্যু বানিয়েছেন।

তার ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে—

ভাড়া নিয়ন্ত্রিত ফ্ল্যাটে ভাড়া বৃদ্ধিতে স্থগিতাদেশ,

সার্বজনীন শিশুসেবা,

বিনামূল্যে বাস চলাচল ব্যবস্থা,

সিটি করপোরেশন পরিচালিত সাশ্রয়ী মুদি দোকান চালু।

নির্বাচনের আগ মুহূর্তে কুইন্সে হাজারো সমর্থকের সামনে তিনি বলেন,

> “যখন আমি প্রচারণা শুরু করি, তখন কোনো টেলিভিশন ক্যামেরা ছিল না।

ফেব্রুয়ারিতেও আমাদের সমর্থন ছিল মাত্র ১ শতাংশ।

কিন্তু আমরা হাল ছাড়িনি—আমরা নিউইয়র্কবাসীর পাশে থেকেছি।

বহুজাতিগত সমর্থন ও তরুণদের বিপুল ভোট:

এনবিসি নিউজের এক্সিট পোল অনুযায়ী, মামদানি সব জাতিগত গোষ্ঠীর ভোটারদের কাছ থেকেই সমর্থন পেয়েছেন।

শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো, এশীয় ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর বড় অংশই তার পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

৪৫ বছরের নিচের ভোটারদের মধ্যে মামদানি কুয়োমোর চেয়ে ৪৩ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন।

অন্যদিকে ৪৫ বছরের ঊর্ধ্বে ভোটারদের মধ্যে কুয়োমো এগিয়ে ছিলেন ১০ পয়েন্টে।

শিক্ষাগত পটভূমি, সামাজিক স্তর ও নিউইয়র্কে নতুন-পুরনো বাসিন্দাদের মধ্যেও ভোটে সুস্পষ্ট বিভাজন দেখা গেছে।।।

ধর্মীয় আক্রমণ ও ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান:

পুরো নির্বাচনী প্রচারণায় মামদানির ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

তার মুসলিম পরিচয় ও ইসরায়েলবিরোধী মন্তব্য নিয়ে বিরূপ প্রচারণা চালালেও ভোটাররা শেষ পর্যন্ত তাকেই সমর্থন দেন।

ইহুদি ভোটারদের মধ্যে কুয়োমো এগিয়ে ছিলেন ৬০% ভোটে, যেখানে মামদানি পান ৩১%।

এক আবেগপূর্ণ ভাষণে মামদানি বলেন,

> “তারা এই নির্বাচনকে বানাতে চেয়েছিল আমার ধর্মবিশ্বাসের ওপর গণভোট।

কিন্তু আমি লড়েছি নিউইয়র্কবাসীর জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের বিরুদ্ধে।”

জাতীয় রাজনীতিতে নতুন প্রভাব:

মামদানির এই জয়ের প্রভাব শুধু নিউইয়র্কেই নয়, পুরো যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে।

ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্ব এখন বিশ্লেষণ করছে—কীভাবে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তরুণ ও শ্রমজীবী শ্রেণিকে সংগঠিত করে এই জয় নিশ্চিত করেছেন।

অন্যদিকে রিপাবলিকান শিবির ইতিমধ্যেই তার বামঘেঁষা নীতিকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক বিভাজনের চেষ্টা শুরু করেছে।

এক পর্যায়ে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন,

> “স্লিওয়াকে ভোট দেওয়া মানে মামদানিকেই ভোট দেওয়া।”

এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত:

নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানির শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম ও প্রগতিশীল রাজনীতির ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের ভাষায়,

> “এটি শুধু একটি শহরের নির্বাচন নয়—এটি এক প্রজন্মের রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের সূচনা।”