চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল ও হালাল মাংসসহ ৪৩টি খাত পাচ্ছে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২৫, ০৩:৫০ পিএম
চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল ও হালাল মাংসসহ ৪৩টি খাত পাচ্ছে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা

ডেস্ক রিপোর্ট:

দেশের রপ্তানি খাতকে আরও বহুমুখী ও প্রতিযোগিতামূলক করতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রণোদনা কিস্তি হিসেবে এক হাজার কোটি টাকা ছাড় করেছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুকূলে এই অর্থ ছাড় করা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটের অধীনে ‘ভর্তুকি ও প্রণোদনা ব্যবস্থাপনা (সাধারণ রপ্তানি প্রণোদনা)’ খাত থেকে বরাদ্দকৃত অর্থ থেকেই এ অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে। এই অর্থের মাধ্যমে দেশীয় শিল্প, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি, চামড়াজাত দ্রব্য, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল, হালাল মাংসসহ বিভিন্ন খাতে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি তৈরি পোশাক রপ্তানির বিপরীতে ১ শতাংশ বিশেষ নগদ সহায়তাও অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন,

> “প্রণোদনার অর্থ নিয়ে নয়ছয় হওয়ার সুযোগ খুবই কম। কারণ প্রকৃত রপ্তানিকারকদের যাচাই-বাছাই করে তবেই এই সহায়তা দেওয়া হয়। রপ্তানির প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, পণ্যের বৈচিত্র্য আনয়ন এবং নতুন বাজার সৃষ্টিই এই প্রণোদনার মূল উদ্দেশ্য।”

অপ্রচলিত খাতকে বিশেষ গুরুত্ব:

সরকার এবার শুধুমাত্র তৈরি পোশাক নয়, বরং অপ্রচলিত রপ্তানি খাতগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ৪৩টি রপ্তানিমুখী খাতে ০.৩০ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হালাল মাংস, হালকা প্রকৌশল এবং পাটজাত পণ্যকে সর্বোচ্চ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. মিজানুর রহমান বলেন,

> “এটা শুধু প্রণোদনা নয়, বরং সরকারের পক্ষ থেকে একটি কৌশলগত বার্তা। সরকার দেখাতে চায়, তারা রপ্তানির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ করছে। তবে সাভারের অনেক ট্যানারি এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ না করায় চামড়া খাতের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।”

ব্যাংকিং জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ:

বগুড়ার একটি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার রওশন আরা বলেন,

> “এই প্রণোদনা আমাদের মতো ছোট রপ্তানিকারকদের জন্য বড় সুযোগ। তবে ব্যাংকিং জটিলতা না কমলে অনেকেই বাস্তবে এর সুফল পাবে না।”

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রণোদনার এই তহবিল কেবল রপ্তানিকারকদের প্রাপ্যতা যাচাইয়ের পর বিতরণ করা যাবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো এই অর্থ অন্য কোনো খাতে ব্যবহার করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভর্তুকি নয়, কৌশলগত বিনিয়োগ:

চলতি অর্থবছরে সরকার মোট ৮৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা ভর্তুকি ও প্রণোদনার জন্য বরাদ্দ রেখেছে। তবে এবার প্রণোদনা শুধু ভর্তুকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন,

> “আগের তুলনায় সরকার এখন অনেক দ্রুত প্রণোদনা ছাড় করছে। এর লক্ষ্য হলো রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন বাজারে প্রবেশে সহায়তা দেওয়া এবং একক খাতের ওপর নির্ভরতা কমানো।”

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক খাতনির্ভর রপ্তানি অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। তবে বৈশ্বিক বাজারে টেকসই অবস্থান ধরে রাখতে হলে কৃষি, চামড়া, হালকা প্রকৌশল, ও আইসিটি খাতের মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ জরুরি। সরকারের এই প্রণোদনা সেই পথকেই শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন তারা।

রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য ও প্রবৃদ্ধি আনতে সরকারের এই নগদ প্রণোদনা এখন শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা যায়, তবে এটি দেশের রপ্তানি খাতকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে পারে।