কাঁকন বাহিনীর শাপ: নিচখানপুরে নির্ঘুম রাত, বন্ধ হাজার বিঘা ফসলের কাজ
রাজশাহী প্রতিনিধি:
রাজশাহী বিভাগের বাঘা উপজেলার নিচখানপুর চরে আবারও আতঙ্ক ফিরে এসেছে। নদীর চরে অবৈধ দখল, অস্ত্রের মহড়া আর টানা গুলির শব্দে ভীত সন্ত্রস্ত স্থানীয় বাসিন্দারা। কুখ্যাত ‘কাঁকন বাহিনী’ ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গোলাগুলিতে তিন নিহত, নিখোঁজ আরও দুইজন
গত ২৭ অক্টোবর সকালে ধান কাটা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে নিচখানপুর চরাঞ্চলে সংঘর্ষ হয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, কাঁকন বাহিনীর সঙ্গে সাধারণ কৃষকদের মধ্যে গোলাগুলিতে ঘটনাস্থলেই দুইজন নিহত হন। পরদিন উদ্ধার হয় আরেকজনের মরদেহ। এলাকাজুড়ে তখন থেকে চলছে তীব্র উত্তেজনা ও নিরাপত্তাহীনতা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, সংঘর্ষের ঘটনায় একাধিক মামলা হয়েছে এবং একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মূল হোতারা এখনও পলাতক।
ভয়ে ফসলের মাঠে যাচ্ছে না কেউ
চরের কৃষকরা বলছেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণে এখন আর কেউ মাঠে যেতে সাহস করছে না।
স্থানীয় কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, “আমরা দিনমজুর মানুষ, মাটিতে হাত দিয়েই খাই। কিন্তু এখন জমিতে গেলেই গুলি বা হামলার ভয়।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, শুধু নিচখানপুর ও আশপাশের এলাকায় প্রায় হাজার বিঘা ধান ও ভুট্টার ক্ষেত অনাবাদী পড়ে আছে।
দীর্ঘদিনের আধিপত্য ও দখলচক্র
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাঁকন বাহিনী বহু বছর ধরে পদ্মা নদীর চরে জমি দখল, বালু উত্তোলন ও কাশ খড়ের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, এ চক্রটি রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নিয়মিত চাঁদাবাজি, দখল ও অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা গ্রামজুড়ে ভয় সঞ্চার করছে।
বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাম্মী আক্তার বলেন,
“গ্রামবাসীর আতঙ্কের বিষয়টি আমরা জানি। নিরাপত্তা জোরদারের জন্য প্রশাসন ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে।”
এদিকে, দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ সোলাইমান বলেন, “ঘটনার তদন্ত চলছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
তবে স্থানীয়দের দাবি, কয়েকজনকে ধরলেই হবে না—বাহিনীর মূল নেতৃত্বকে না ধরলে শান্তি ফিরবে না।
চরবাসীর কান্না ও অজানা ভয়
এলাকার দোকানপাট বন্ধ, রাতে ঘর থেকে কেউ বের হয় না। অনেকে আশ্রয় নিয়েছে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে।
মুদি দোকানি লালচাঁদ বলেন, “রাতে একটু শব্দ হলেই সবাই ভাবি, আবার গুলি শুরু হলো কিনা!”
শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না। পরিবারের উপার্জন বন্ধ, ক্ষেতের ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—এ যেন এক নীরব মানবিক বিপর্যয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—চরাঞ্চলের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, সীমিত টহল, এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণেই সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে।
এখনই প্রয়োজন—
নিয়মিত র্যাব-পুলিশের যৌথ অভিযান ও ড্রোন নজরদারি,
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন, এবং অবৈধ দখল ও বালু ব্যবসা বন্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা।
নিচখানপুর আজ শুধু একটি গ্রাম নয়—এটি হয়ে উঠেছে ভয়, হতাশা ও নীরব আর্তনাদের প্রতীক।
গ্রামের প্রবীণ আব্দুস সালাম কাঁপা গলায় বলেন, “মাটিতে কাজ করতে ভয় লাগে। পুলিশ এলে একটু সাহস পাই, কিন্তু তারা চলে গেলে আবার আতঙ্ক।”
চরাঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে এখনই লাগবে স্থায়ী ও সমন্বিত পদক্ষেপ। নইলে নিচখানপুরের নির্ঘুম রাত আরও অনেক গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে।









