গাজীপুরে কারখানার দূষিত পানি খেয়ে দুই শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ, কারখানা বন্ধ ঘোষণা

প্রকাশিত: ১৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৭ পিএম
গাজীপুরে কারখানার দূষিত পানি খেয়ে দুই শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ, কারখানা বন্ধ ঘোষণা

শাকিল হোসেন, কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধিঃ

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চান্দরা-ত্রিমোড় সংলগ্ন ভাতারিয়া এলাকায় ড্রেসম্যান গার্মেন্টস লিমিটেড পোশাক কারখানায় দূষিত পানি পান করে ১৫০-এর বেশি শ্রমিক একযোগে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকাল ৯টায় টিফিনের সময় ওয়াটার ফিল্টার থেকে পানি পানের পরপরই শ্রমিকদের মধ্যে বমি, তীব্র পেটব্যথা, মাথাঘুরা ও দুর্বলতা দেখা দেয়। মুহূর্তে কারখানাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে জরুরি ভিত্তিতে ড্রেসম্যান কারখানার উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত শ্রমিকরা জানান, সকাল ৯টার দিকে কয়েকশ শ্রমিক একসাথে ফিল্টারের পানি পান করেন। পানি পানের মাত্র ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই প্রথমে কয়েকজন বমি করতে থাকেন। এরপর দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে। ১৫০শতাধিক শ্রমিক মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাতরাতে থাকেন। কারখানা কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুলেন্স,পিকআপ ও প্রাইভেট গাড়ি দিয়ে অসুস্থ শ্রমিকদের দ্রুত কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আশপাশের ক্লিনিক ও গাজীপুর সদর হাসপাতালে পাঠান। খবর পেয়ে শ্রমিকদের স্বজনরাও হাসপাতালে ভিড় করেন।

আহত শ্রমিক রুনা আক্তার বলেন,পানিটা খেতেই কেমন পচা গন্ধ লাগল। ৫ মিনিট পর পেটের ভিতর মোচড় দিয়ে ব্যথা শুরু হলো। বমি করতে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলাম। এখনও শরীরে শক্তি পাচ্ছি না।

অপর শ্রমিক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কয়েকদিন ধরেই পানির স্বাদ নষ্ট ছিল। ম্যানেজমেন্টকে বলেও লাভ হয়নি। আজ এত বড় বিপদ হয়ে গেল।

কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা জানান, সকাল ৯টা থেকে বেশকিছু শ্রমিক বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা ও মাথাঘুরা নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। উপসর্গ দেখে প্রাথমিকভাবে ফুড পয়জনিং বা দূষিত পানিবাহিত রোগ বলে ধারণা করা হচ্ছে। সবাইকে স্যালাইন, এন্টিবায়োটিক ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে কারো অবস্থা আশঙ্কাজনক নয়। তবে ৩০-৪০ জনকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, বেশিরভাগ শ্রমিককে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হলেও গুরুতর ৩০-৪০ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

ড্রেসম্যান পোশাক কারখানার সহকারী জেনারেল ম্যানেজার আতিকুল ইসলাম বলেন,হঠাৎ বৃষ্টিতে কারখানার আশেপাশের এলাকায় শ্রমিকরা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকত। তারা আজ সকাল বেলা কী ধরনের পানি ও খাবার খেয়েছে আমার জানা নেই। আমাদের কারখানার ডিপ টিউবওয়েল ও ফিল্টারের পানি নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়।

তবে শ্রমিকদের অভিযোগ, গত কয়েকদিন ধরে পানির রং ও গন্ধ পরিবর্তন হলেও কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নেয়নি।

ঘটনার পর ভাতারিয়া ও আশপাশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রমিক নেতা বলেন, কোটি টাকার পোশাক রপ্তানি করে মালিকরা লাভবান হচ্ছেন, অথচ শ্রমিকদের নিরাপদ খাবার পানি দিতে পারছেন না। এটা অমানবিক। সরকারের উচিত প্রতিটি গার্মেন্টসে পানি পরীক্ষার রিপোর্ট বাধ্যতামূলক করা।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, গার্মেন্টস শিল্প এলাকায় ডিপ টিউবওয়েলের পানি আর্সেনিক, লোহা ও ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফিল্টার নিয়মিত সার্ভিসিং না করলে পানিতে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া জন্মায়, যা ফুড পয়জনিং ও ডায়রিয়ার কারণ।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ঘটনার পর ড্রেসম্যান গার্মেন্টস কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগ কারখানার ডিপ টিউবওয়েল ও ফিল্টারের পানি সিলগালা করে নমুনা সংগ্রহ করেছে। রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত পানি ব্যবহার বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

১৮ জুন বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চান্দরা-ত্রিমোড় সংলগ্ন ভাতারিয়া এলাকায় "ড্রেসম্যান গার্মেন্টস লিমিটেড" কারখানায় দূষিত পানি পান করে ২০০-এর বেশি শ্রমিক বমি, পেটব্যথা ও মাথাঘুরা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আহতদের কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও গাজীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ফুড পয়জনিং ধারণা করে পানির নমুনা পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পর কারখানার উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রমিক ও শ্রমিক নেতারা সব গার্মেন্টসে নিরাপদ পানি ও নিয়মিত পানি পরীক্ষার বাধ্যতামূলক দাবি জানিয়েছেন।