জাবিতে জুলাই হামলায় অভিযুক্তদের ‘গুপ্ত আপিল কমিটি’র দায়মুক্তি, অভিযোগ শিক্ষার্থীদের

প্রকাশিত: ১৮ জুন ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম
জাবিতে জুলাই হামলায় অভিযুক্তদের ‘গুপ্ত আপিল কমিটি’র দায়মুক্তি, অভিযোগ শিক্ষার্থীদের

জাবি প্রতিবেদক:

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) জুলাই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাকর্মীকে একটি ‘গুপ্ত আপিল কমিটি’র মাধ্যমে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। 

তাঁদের দাবি, আপিল কমিটি গঠন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া গোপনে হয়েছে এবং এতে ভুক্তভোগী বা সাক্ষীদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত নিয়ে আয়োজিত এক উন্মুক্ত আলোচনা সভায় বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিকাল ৪টায় সিনেট ভবনে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসানের কাছে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা। 

সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্কসবাদী) জাবি সংসদের সংগঠক সজিব আহমেদ জেনিচ বলেন, "আপনারা জুলাইয়ের প্রোডাক্ট, কিন্তু সেই স্পিরিট আপনাদের মধ্যে নেই। একটি গুপ্ত আপিল কমিটি করে অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দিয়েছেন। এ বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি।"

আলোচনায় শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, সাক্ষীদের পরিচয় ফাঁস হওয়ায় তাঁরা ও তাঁদের পরিবার হুমকির মুখে পড়েছেন। দায়মুক্তিপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে কী ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, পুনর্তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং ক্যাম্পাসে তাঁদের প্রবেশ ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।

শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করেন, তৎকালীন প্রক্টরের ভূমিকা, হামলায় অভিযুক্ত কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তা ও একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং অনেকের শাস্তি লঘু করায় বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, এতে ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসে সহিংস রাজনীতির পুনরুত্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও ফার্মেসী বিভাগের অধ্যাপক ড সোহেল রানাকে আহবায়ক এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজাকে সদস্য সচিব করে পাঁচ সদস্যদের একটি আপিল তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। 

এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে জাবি শিক্ষার্থীদের উপর হামলায় অভিযুক্ত ছাত্রলীগের ৪৩ নেতাকর্মীর শাস্তি পুনর্বিবেচনার আবেদন থেকে ১৬ নেতাকর্মীর শাস্তি মওকুফ করা হয়।

এদিকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দায়মুক্তির অভিযোগের প্রেক্ষিতে আপিল কমিটির প্রধান ও ফার্মেসী বিভাগের অধ্যাপক সোহেল রানা বলেন, “যেসব অভিযোগের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ বা ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়নি, সেসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই আপিল কমিটি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, “অপরাধী বেঁচে যাক, কিন্তু নির্দোষ যেন শাস্তির আওতায় না আসে। বিশ্ববিদ্যালয় আবেগ নয়, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেবল কোনো ব্যক্তি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, এ কারণেই শাস্তি দেওয়া যাবে না। বিচার হতে হবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে।”

তিনি আরও বলেন, “সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় আবেদন এলে এবং সিন্ডিকেটে ঐকমত্য তৈরি হলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। বহিরাগতদের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়টি দেখা হবে, সাক্ষীদের তথ্য ফাঁসের ঘটনাও তদন্ত করা হবে। পাশাপাশি আইসিটি আইনে দায়ের হওয়া মামলার অগ্রগতিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদারকি করবে।”

উল্লেখ্য, মতবিনিময় সভায় উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. শামছুল আলম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক এ কে এম নজরুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড আব্দুর রব, প্রক্টর অধ্যাপক ড এ কে এম রাশিদুল আলম, আপিল কমিটির প্রধান অধ্যাপক সোহেল রানা ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।