মানবতা, সহনশীলতা ও শান্তির পক্ষে বৈশ্বিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের যোগাযোগকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি ঘৃণা, বিদ্বেষ ও বিভাজনমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও বৃদ্ধি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমের মাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এমন বক্তব্যের শিকার হচ্ছে যা তাদের ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, জাতিগত পরিচয়, লিঙ্গ, সংস্কৃতি কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে হেয়প্রতিপন্ন করে। এই ধরনের বক্তব্য শুধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্মানহানিই ঘটায় না, বরং সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে, সহিংসতা উসকে দেয় এবং মানবাধিকারের জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় জাতিসংঘ ১৮ জুনকে “ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক দিবস” হিসেবে ঘোষণা করেছে। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বব্যাপী ঘৃণামূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
ঘৃণামূলক বক্তব্য বলতে এমন সব মৌখিক, লিখিত বা দৃশ্যমান প্রকাশকে বোঝায় যা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে তাদের পরিচয়ের ভিত্তিতে অপমান, হেয়প্রতিপন্ন, বৈষম্য বা সহিংসতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
এ ধরনের বক্তব্যের লক্ষ্য সাধারণত ধর্মীয় সংখ্যালঘু, জাতিগত গোষ্ঠী, অভিবাসী, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অথবা ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষ হয়ে থাকে। ঘৃণামূলক বক্তব্য সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি করে এবং মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস ও বৈরিতা বাড়িয়ে তোলে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘৃণামূলক বক্তব্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় জাতিসংঘ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার ঘৃণার বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা, সংঘাত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০২১ সালে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং ১৮ জুনকে “International Day for Countering Hate Speech” হিসেবে ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে বিশ্ব সম্প্রদায়কে ঘৃণার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
ঘৃণামূলক বক্তব্য মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে। এটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা নষ্ট করে এবং সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে।
ইতিহাসে বহু গণহত্যা, দাঙ্গা ও সংঘাতের পেছনে ঘৃণামূলক প্রচারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিদ্বেষমূলক বক্তব্য অনেক সময় সরাসরি সহিংসতার দিকে মানুষকে প্ররোচিত করে।
যারা ঘৃণামূলক বক্তব্যের শিকার হন, তারা প্রায়ই মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগেন।
ঘৃণার সংস্কৃতি মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিবেশকে সংকুচিত করে। এতে ভিন্নমত প্রকাশ কঠিন হয়ে পড়ে এবং গণতন্ত্র দুর্বল হয়।
প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা ও সমান অধিকারের স্বীকৃতি মানবাধিকারের মূল ভিত্তি। ঘৃণামূলক বক্তব্য সেই ভিত্তিকেই আঘাত করে।
ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স, টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ মতামত প্রকাশ করে।
তবে এসব প্ল্যাটফর্মে ভুয়া তথ্য, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং উসকানিমূলক বক্তব্যও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অ্যালগরিদমভিত্তিক প্রচারণার কারণে অনেক সময় উত্তেজনাপূর্ণ ও বিতর্কিত কনটেন্ট বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
এ কারণে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব হলো ঘৃণামূলক কনটেন্ট শনাক্ত করা, অপসারণ করা এবং নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা।
ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রতিরোধে শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা মানুষকে যুক্তিবাদী, সহনশীল এবং মানবিক করে তোলে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানবাধিকার, নৈতিকতা, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সামাজিক সম্প্রীতির শিক্ষা প্রদান করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ঘৃণা নয়, বরং সম্মান ও সহমর্মিতার মূল্যবোধে বিশ্বাসী হবে।
শুধু পাঠ্যপুস্তক নয়, পরিবার ও সমাজকেও এই শিক্ষার অংশ হতে হবে।
বিশ্বে নানা ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করে। এই বৈচিত্র্য মানবসভ্যতার অন্যতম সৌন্দর্য।
যখন মানুষ অন্যের বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে সম্মান করতে শেখে, তখন ঘৃণার জায়গা সংকুচিত হয়। ধর্মীয় সহনশীলতা ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গণমাধ্যম সমাজ গঠনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ঘৃণা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই, নিরপেক্ষতা এবং সংবেদনশীলতা বজায় রাখা প্রয়োজন। কোনো গোষ্ঠীকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা বা উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে এমন তথ্য প্রচার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
তরুণরা সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। তারা যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ করে এবং ঘৃণার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলে, তাহলে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।
তরুণদের উচিত—
* ভুয়া তথ্য যাচাই করা।
* বিদ্বেষমূলক পোস্ট শেয়ার না করা।
* সহনশীলতা ও মানবতার পক্ষে কথা বলা।
* অনলাইন বুলিং ও ঘৃণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা।
* ইতিবাচক সামাজিক উদ্যোগে অংশগ্রহণ করে।
বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সামাজিক সহাবস্থানের দীর্ঘ ঐতিহ্য বহন করে। তবে ডিজিটাল যুগে এখানে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও গুজবের কারণে বিভিন্ন সময় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এ কারণে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের তরুণ সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সংগঠনগুলো ঘৃণার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রতিরোধ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; বরং এটি সমগ্র সমাজের যৌথ দায়িত্ব।
সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ ঘৃণার বিরুদ্ধে লড়াই কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা, শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ।
ভবিষ্যতের করণীয়ঃ
১. ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি করা।
২. মানবাধিকার ভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ করা।
৩. অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন করা।
৪. আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ বৃদ্ধি করা।
৫. তরুণদের ইতিবাচক সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা।
৬. ভুয়া তথ্য ও গুজব প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৭. সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা।
ঘৃণামূলক বক্তব্য শুধু কিছু শব্দের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং সামাজিক শান্তির ওপর সরাসরি আঘাত। একটি সভ্য, মানবিক ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়তে হলে ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা, বিভেদের পরিবর্তে ঐক্য এবং বিদ্বেষের পরিবর্তে সহমর্মিতার চর্চা করতে হবে।
আজকের এই “ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক দিবস” আমাদের সেই বার্তাই স্মরণ করিয়ে দেয়— মানুষে মানুষে সম্মান, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছাড়া টেকসই শান্তি সম্ভব নয়। আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ঘৃণার বিরুদ্ধে দাঁড়াই এবং এমন একটি পৃথিবী গড়ে তুলি যেখানে বৈচিত্র্যকে ভয় নয়, বরং শক্তি হিসেবে দেখা হবে; যেখানে মানবতাই হবে সর্বোচ্চ পরিচয়।
ওমায়ের আহমেদ শাওন
(লেখক, কলামিস্ট ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক)।








