চট্টগ্রামে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় আতঙ্ক, ২৪ ঘণ্টায় একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তার
মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম মহানগরে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল এই চার মাসে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)-এর আওতাধীন ১৬ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ১৪৯টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন অন্তত একটি করে মামলা দায়ের হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় নগরজুড়ে জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে শিশু সুরক্ষায় আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাকলিয়ায় শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, এলাকায় উত্তেজনা ও সংঘর্ষ
গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) নগরের বাকলিয়ার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মনির হোসেন (৩০) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ঘটনায় শিশুর বাবা বাদী হয়ে মামলা করেন।
ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত স্থানীয়দের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে। সংঘর্ষে দুই সাংবাদিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন।
২৪ ঘণ্টায় আরও একাধিক ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
বাকলিয়ার ঘটনার রেশ না কাটতেই পরদিন (২২ মে) নগরের বিভিন্ন এলাকায় আরও কয়েকটি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে।
এর মধ্যে চান্দগাঁও থানার সিএন্ডবি টেকবাজার এলাকার ইব্রাহিম কলোনিতে চার বছরের এক শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে আশফাকুর রহমান (৫৫) নামের এক মুদি দোকানিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মামলার এজাহারে বলা হয়, শিশুটির পরিবার নিয়মিত ওই দোকান থেকে কেনাকাটা করত। গত ১৫ মে রাতে শিশুটিকে একা পেয়ে দোকানের ভেতরে নিয়ে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে শিশুটির মা থানায় মামলা করেন।
একই দিন বায়েজিদ বোস্তামী থানার মোহাম্মদ নগর এলাকায় পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মো. হাসান (৪২) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ১০ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে শিশুটিকে ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়।
অন্যদিকে খুলশী থানার আমবাগান এলাকায় দুই শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আব্দুল বাতেন নামের এক মাদ্রাসা শিক্ষককে হেফাজতে নেয় পুলিশ। স্থানীয়রা তাঁকে আটক করে গণপিটুনি দেয় বলে জানা গেছে। তিনি ওই এলাকার একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতেন।
ডবলমুরিং থানার হাজীপাড়া এলাকায় সাত ও ১১ বছর বয়সী দুই শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে স্থানীয়রা এক ব্যক্তিকে আটক করে মারধর করে। পরে পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। প্রায় দুই ঘণ্টা পুলিশকে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয় বলে জানা গেছে।
চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা, দ্রুত তদন্তের নির্দেশ পুলিশের
ভুক্তভোগী শিশুদের চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-এর ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিটি ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর উপ-কমিশনার (ক্রাইম) মো. রইছ উদ্দিন বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সব থানাকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রমাণ নিশ্চিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিশু নির্যাতনের পেছনে একাধিক সামাজিক ও মানসিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো
বিকৃত মানসিকতা, মাদকাসক্তি, নৈতিক অবক্ষয়, পর্নোগ্রাফির নেতিবাচক প্রভাব, পারিবারিক অস্থিরতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক অপরাধী শিশুকে সহজ লক্ষ্য হিসেবে দেখে এবং ভয়, লজ্জা বা অসহায়ত্বের কারণে তারা প্রতিবাদ করতে পারবে না এই ধারণা থেকেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে উদ্বেগ
আইনজীবী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এ ধরনের অপরাধ দমনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণে বিলম্বের কারণে অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
এর ফলে ভুক্তভোগী পরিবার হতাশ হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে আসামিরা জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল–এর সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, শিশু ধর্ষণ মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিতের বিধান থাকলেও বাস্তবে সাক্ষী হাজিরা ও তদন্তগত জটিলতায় সময় লাগে।
সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, শিশু ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন নয়, সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিক মূল্যবোধ জোরদার করা জরুরি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তাদের মতে, অপরাধ দমন ও প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই হতে পারে কার্যকর সমাধান।








